বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ ০১:০৮ এএম
চিরসবুজ নায়ক জাফর ইকবাল। একই সঙ্গে গায়ক ও নায়ক ছিলেন তিনি। চলচ্চিত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন সফল ও হিট নায়ক হিসেবে। স্বাধীনতার ডাক শুনে অস্ত্র হাতে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধেও।
জীবন তার অনেক সংগ্রামের রঙে রঙিন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যখনই ঢাকাই সিনেমার আকাশে নক্ষত্র হয়ে জ্বলে উঠলেন, তখনই অকালমৃত্যু কেড়ে নিল সব আলো। চিরসবুজ এ নায়কের ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। পৃথিবী থেকে প্রস্থানের তিন দশক পেরিয়েও তিনি এ দেশের সিনেমাপ্রেমী মানুষের কাছে স্মরণীয়, শ্রদ্ধেয়।
ঢাকাই ছবিতে জাফর ইকবাল ছিলেন সত্তর ও আশির দশকের হার্টথ্রুব নায়ক। তাকে স্টাইল আইকন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন সে সময়ের তরুণরা। তার অভিনীত ছবি দিয়ে সহজে লাভবান হতেন পরিচালক ও প্রযোজকরা।
জাফর ইকবাল জন্মেছিলেন ১৯৫০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে। বাড়িতে গান-বাজনার রেওয়াজ ছিল। তার বোন শাহানাজ রহমতুল্লাহ একজন সুপরিচিত কণ্ঠশিল্পী। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজও নামকরা সংগীতজ্ঞ। তিনি ছিলেন সংগীত পরিচালক। ভাই ও বোনের মতো জাফর ইকবালও প্রথমে গানের ভুবনেই যাত্রা করেছিলেন গায়ক হিসেবে।
১৯৬৬ সালে বন্ধু তোতা, মাহমুদ ও ফারুককে নিয়ে গঠন করেন ব্যান্ড গ্রুপ ‘রোলিং স্টোন’। এলভিস প্রিসলি ছিল তার প্রিয় তারকা। স্কুলে কোনো ফাংশন হলে তিনি গিটার বাজিয়ে প্রিসলির গান গাইতেন। ‘পিচ ঢালা পথ’ ছিল ব্যান্ড গড়ে তোলার পর তার প্রথম গাওয়া গান।
ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে নায়করাজ রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ ছবিতে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ গান গেয়ে চলচ্চিত্রে গায়ক হিসেবে তার অভিষেক হয়। প্রথম প্লেব্যাকেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান এ অভিনেতা। এরপর সুরকার আলাউদ্দিন আলী তাকে দিয়ে অসংখ্য চলচ্চিত্রে কাজ করিয়েছিলেন।
তার জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী, হয়ে কারও ঘরনী’, ‘তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন’, ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’অন্যতম। নিজের কণ্ঠে ‘কেন তুমি কাঁদালে’শিরোনামে একটি অডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যুগে ‘সুখে থাকো নন্দিনী’গানটি গেয়ে দারুণ সাড়া ফেলেছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর উদযাপন বিশেষ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন ‘এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে’গানটি। পরে শিল্পী রফিকুল আলমও গানটি গেয়েছিলেন।
গান গেয়েই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং অভিনেতা খান আতাউর রহমানের সঙ্গে। তার অভিনীত প্রথম ছবির নাম ‘আপন পর’। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৬৯ সালে। খান আতাউর রহমান পরিচালিত এ ছবিতে তার সঙ্গে ছিলেন কবরী। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জাফর ইকবাল।
যুদ্ধ শেষে আবারও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ‘মাস্তান’ছবিটি তাকে সে প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। সামাজিক প্রেমকাহিনি ‘মাস্তান’-এর নায়ক জাফর ইকবাল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। ‘নয়নের আলো’চলচ্চিত্রে এক গ্রামীণ তরুণের চরিত্রেও দর্শক তাকে গ্রহণ করে দারুণভাবে।
জাফর ইকবাল অভিনীত ত্রিভুজ প্রেমের ছবি ‘অবুঝ হৃদয়’দারুণ ব্যবসাসফল হয়। এ ছবিতে চম্পা ও ববিতা দুই বোনের বিপরীতে তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করে।
ববিতার সঙ্গে তার জুটি ছিল দর্শকনন্দিত। ববিতার বিপরীতে সর্বাধিক ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল।
ক্যারিয়ারে জাফর ইকবাল ১৫০টির মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসাসফল। তিনি প্রযোজক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ‘প্রেমিক’সিনেমাটি তার প্রযোজনায় নির্মিত।
ব্যক্তিজীবনে ভালোবেসেই তিনি বিয়ে করেছিলেন চলচ্চিত্রের বাইরের মানুষ সোনিয়াকে। সোনিয়া-জাফর দম্পতির দুই ছেলেসন্তানও রয়েছে।