মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬ ১৮:২৭ পিএম
ছবি: কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে।
একসময় টেলিভিশন চ্যানেলের সময়সূচি অনুযায়ী বসে থাকতে হতো দর্শককে। রাত ৮টার নাটক, শুক্রবারের বিশেষ অনুষ্ঠান বা উৎসবের সিনেমাÑ সবকিছুই ছিল নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায়। কিন্তু এখন সেই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। দর্শকের ‘রিমোট’ যেন চলে গেছে ওটিটি প্লাটফর্মগুলোর হাতে। কখন, কী দেখবেÑ সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে দর্শক নিজেই, আর সেই চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ওটিটি।
বাংলাদেশে এবং বৈশ্বিকভাবেই বিনোদন জগতে যে বড় পরিবর্তনটি এসেছে, তার নাম ওটিটি কনটেন্ট। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, চরকি, হইচই কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্লাটফর্মÑ সব মিলিয়ে এখন কনটেন্ট দেখার অভ্যাস সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ছোটপর্দার নাটক, শর্ট ফিল্ম, এমনকি সিনেমাও এখন অনেকাংশে ওটিটি নির্ভর হয়ে পড়েছে।
আগে যেখানে টেলিভিশন ছিল নাটকের প্রধান বাজার, এখন সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে ইউটিউব ও ওটিটি প্লাটফর্ম। নির্মাতা, অভিনেতা, এমনকি প্রযোজকরাও এখন কনটেন্ট বানানোর আগে ভাবছেনÑ এটি ইউটিউবে কতটা ভিউ পাবে বা ওটিটিতে কতটা দর্শক টানবে। দর্শকের পছন্দও এখন অনেক বেশি ডিজিটাল এবং অন-ডিমান্ড।
নাট্যনির্মাতা ও প্রযোজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন অনেক নাটকের বাজেট, গল্প নির্বাচন এমনকি কাস্টিংও নির্ভর করছে অনলাইন দর্শকের চাহিদার ওপর। টিভি চ্যানেলের জন্য বানানো কনটেন্টের চেয়ে ইউটিউব-ওটিটিতে রিলিজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ সেখানে রয়েছে সরাসরি রিচ, ভিউ এবং আয়ের সুযোগ।
শুধু নাটকই নয়, ছোট সিনেমা বা শর্ট ফিল্মও এখন ওটিটি নির্ভর। অনেক নতুন নির্মাতা সিনেমা হলের বদলে প্রথমেই ডিজিটাল রিলিজকে বেছে নিচ্ছেন। এতে তারা দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন এবং আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন।
অভিনয়শিল্পীরাও এখন ওটিটি কেন্দ্রিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন। অনেক জনপ্রিয় টিভি মুখ এখন নিয়মিত ওটিটি কনটেন্টে কাজ করছেন। কারণ এখানে চরিত্রের বৈচিত্র্য বেশি, গল্প বলার স্বাধীনতাও তুলনামূলকভাবে বেশি।
এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটি দর্শকের মানসিকতারও পরিবর্তন। মানুষ এখন আর নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষায় থাকতে চায় না। তারা চায় নিজের সুবিধামতো সময় অনুযায়ী কনটেন্ট দেখতে। মোবাইল ফোনই এখন হয়ে উঠেছে প্রধান বিনোদন মাধ্যম।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। টেলিভিশন নাটকের দর্শক কমে যাওয়া, মানসম্মত কনটেন্টের চাপে প্রতিযোগিতা এবং ভিউ-নির্ভর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতাÑ সব মিলিয়ে বিনোদন অঙ্গন এক ধরনের নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এখানে দ্বিধার কোনো অবকাশ নেই যে, দর্শকের নিয়ন্ত্রণ এখন আর চ্যানেলের হাতে নয়, বরং ওটিটির হাতে। কনটেন্ট কখন, কোথায়, কীভাবে দেখা হবেÑ এই সিদ্ধান্ত এখন সম্পূর্ণভাবে দর্শকের। আর এই পরিবর্তনই বিনোদন শিল্পকে নিয়ে যাচ্ছে এক নতুন যুগে, যেখানে গল্পের সঙ্গে প্রযুক্তি আর দর্শকের স্বাধীনতা মিলেমিশে তৈরি করছে নতুন বাস্তবতা।
তাই বলাই যায়, প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও সহজলভ্যতায় প্রথাগত টেলিভিশনের যুগ পেরিয়ে এখন বিনোদনের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ওটিটি প্লাটফর্মের হাতে। দর্শকরা এখন নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে বসে অনুষ্ঠান দেখার পরিবর্তে, নিজের স্মার্টফোন বা স্মার্ট টিভিতে যখন-তখন নিজেদের পছন্দের কনটেন্ট উপভোগ করছেন।
ওটিটির রমরমা অবস্থা
নিজের পছন্দমতো কনটেন্ট দেখার স্বাধীনতা রয়েছে। এখন আর আগের মতো প্রচলিত টিভি চ্যানেলের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা খবরের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। দর্শকরা এখন নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে পজ, রিওয়াইন্ড ও ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে কনটেন্ট দেখতে পারেন।
দেশি-বিদেশি কনটেন্টের সমাহার ও রয়েছে বেশ। নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, চরকি, হইচই বা আইস্ক্রিনের মতো প্লাটফর্মগুলোর কল্যাণে বৈচিত্র্যময় সিনেমা ও ওয়েব সিরিজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। নাটক কিংবা সিনেমা দেখতে গেলেই সামনে হঠাৎ করে চলে আসে বিজ্ঞাপনÑ যা অনেক সময় কনটেন্ট থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয় বা বিরক্তও হন অনেকে। তাই বিজ্ঞাপনমুক্ত বিনোদন পেতে ওটিটি প্লাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে বিজ্ঞাপনহীন ও নিরবচ্ছিন্নভাবে কনটেন্ট দেখার সুবিধা পাওয়া যায়।