মাহমুদা বিশ্বাস
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:০৫ পিএম
ঝলমলে আলো, করতালি আর ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মাঝেও কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো শুধু সাফল্যের নয়Ñ একটি দীর্ঘ অপেক্ষার, নীরব সাধনার এবং নিজেকে প্রমাণ করার গল্প বলে। আফরান নিশোর জন্য ঠিক তেমনই এক মুহূর্ত হয়ে রইল তার প্রথম সিনেমাতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়। ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা এবার বড়পর্দাতেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখলেনÑ মুকুট ছাড়াই সম্রাট হয়ে।
২০২৩ সালের আলোচিত ও বক্স অফিস কাঁপানো সিনেমা ‘সুড়ঙ্গ’-এ অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (প্রধান চরিত্র) বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন আফরান নিশো। এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং দীর্ঘদিনের টেলিভিশন ক্যারিয়ার পেরিয়ে বড়পর্দায় তার সার্থক অভিযাত্রার ঘোষণা। যে অভিনেতা বছরের পর বছর ছোটপর্দায় দর্শকের আবেগে জায়গা করে নিয়েছেন, তিনি যে সিনেমাতেও সমান শক্তিশালী ‘সুড়ঙ্গ’ সেই প্রমাণই দিয়েছে।
আফরান নিশোর অভিনয় মানেই চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। ‘সুড়ঙ্গ’-তেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একজন সাধারণ মানুষের জীবন, তার ভালোবাসা, অপরাধবোধ, ভুল সিদ্ধান্ত আর সেই ভুলের পরিণতিতে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার গল্প নিশো পর্দায় এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শককে শুধু দেখায়নি, ভাবতে বাধ্য করেছে। চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্ব, নীরব যন্ত্রণা আর মানসিক টানাপড়েনÑ তার অভিনয়ে হয়ে উঠেছিল স্পষ্ট ও জীবন্ত। সংলাপের চেয়েও চোখের ভাষা, শরীরী ভঙ্গি আর নীরবতায় তিনি বলে গেছেন অনেক কথা।
এই সিনেমার আরেকটি বড় শক্তি ছিল পরিচালক রায়হান রাফী ও আফরান নিশোর যুগলবন্দি। রাফীর নির্মাণশৈলী আর নিশোর অভিনয় একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক শক্তিশালী সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা। ‘সুড়ঙ্গ’ কেবল একটি থ্রিলার বা ড্রামা নয়, এটি মানুষের ভেতরের অন্ধকার আর আলোর সংঘর্ষের গল্প। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে নিশোর উপস্থিতি সিনেমাটিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
ছোটপর্দায় আফরান নিশোর যাত্রা শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে। ধারাবাহিক নাটক, টেলিফিল্ম আর ওয়েব কনটেন্টে তিনি নিজেকে বারবার নতুনভাবে প্রমাণ করেছেন। কখনও রোমান্টিক নায়ক, কখনও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি এক সাধারণ মানুষÑ প্রতিটি চরিত্রেই তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য। তবে সিনেমায় তার অভিষেক নিয়ে দর্শকের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। সেই প্রত্যাশার ভার বহন করা সহজ ছিল না। কিন্তু ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে নিশো দেখিয়ে দিয়েছেন, বড়পর্দার ভাষাও তিনি সমান দক্ষতায় আয়ত্তে আনতে পারেন।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলা সিনেমার জন্যও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ এই পুরস্কার প্রমাণ করে যে টেলিভিশন থেকে আসা একজন অভিনেতা সঠিক গল্প, সঠিক নির্মাতা আর নিজের অভিনয়শক্তি দিয়ে সিনেমার মূলধারায়ও নেতৃত্ব দিতে পারেন। নিশোর এই অর্জন অনেক তরুণ অভিনেতার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
পুরস্কার ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় ভেসে যান আফরান নিশো। ভক্তদের অনেকেই লিখেছেনÑ এটি ছিল বহুদিনের প্রাপ্য স্বীকৃতি। কেউ কেউ আবার বলেছেন, এটি শুধু শুরু; সামনে নিশোর কাছ থেকে আরও শক্তিশালী চরিত্র ও গল্প দেখার অপেক্ষায় তারা।
প্রথম সিনেমাতেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় আফরান নিশোর ক্যারিয়ারের এক মাইলফলক অধ্যায়। ছোটপর্দার ‘বস’ থেকে বড়পর্দার পুরস্কৃত অভিনেতাÑ এই যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিভা আর নিষ্ঠা থাকলে মাধ্যম বদলালেও সাফল্যের ঠিকানাটা বদলায় না। ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে যে পথের সূচনা হলো, সেই পথ ধরে আফরান নিশো আরও কত দূর যানÑ এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
এ ছাড়া আফরান নিশো এবং মেহজাবীন চৌধুরী প্রথমবারের মতো বড়পর্দার সিনেমায় জুটি বেঁধে কাজ করতে যাচ্ছেন। সিনেমার নাম ‘পুলসিরাত’। এটি একটি রোমান্টিক থ্রিলার হিসেবে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুত হচ্ছে।