ফিরে দেখা ২০২৫
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:১১ পিএম
গত বছরের গণঅভ্যুত্থান সংগীতাঙ্গনে এক নতুন ভাষা ও কণ্ঠস্বরের জন্ম দিয়েছিল- প্রতিবাদী সুর, বিকল্প প্রকাশভঙ্গি ও স্বাধীন মিউজিক প্রোডাকশনের যে ঢেউ উঠেছিল, তা ২০২৫ সালে এসে আবার মিশে গেছে মূলধারার চিরচেনা প্রবাহে। তবে ফিরে যাওয়া মানে পিছিয়ে যাওয়া নয়, বরং এটি ছিল পরিণত প্রত্যাবর্তন। সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজ ও স্বতন্ত্র সংগীতÑ সব মাধ্যমেই ছিল সুরের বহুমাত্রিক উপস্থিতি, যদিও শ্রোতা-প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবের অনুপাত একেক মাধ্যমে একেক রকম।
শ্রোতার মনোযোগের মানদণ্ডে ২০২৫ সালের সিনেমার গান ছিল বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়Ñ মোট প্রকাশিত গানের প্রায় ৩৫% গানই দর্শক-শ্রোতার আলাপ, প্লেলিস্ট ও অনলাইন ট্রেন্ডে জায়গা করে নেয়। দেশীয় সিনেমার সংগীতে গত কয়েক বছর ধরে যে বৈচিত্র্যের বীজ বোনা হচ্ছিল, ২০২৫ ছিল তার পূর্ণ বিকাশের বছর। ফিউশন ঘরানা হয়ে ওঠে সময়ের প্রধান সংগীতভাষাÑ লোকজ, পপ, র্যাপ, ইলেকট্রনিক ও ঐতিহ্যবাহী সুরের সংমিশ্রণে তৈরি হয় নতুন ধ্বনিদর্শন।
বছরের আলোচিত নিরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ছিল ‘তাণ্ডব’ সিনেমার ‘লিচুর বাগানে’Ñ ঘেঁটু গানের লোকজ শেকড় অক্ষুণ্ন রেখে এতে পপ-ফিউশনের আধুনিক ছন্দ যুক্ত করেন প্রীতম হাসান, সঙ্গে ছিলেন জেফার রহমান, মঙ্গল মিয়া ও আলেয়া বেগমÑ যা প্রজন্মভেদে শ্রোতাদের একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়। নস্টালজিয়া-রিমিক্স ট্রেন্ডে আরেক বিস্ময় ছিল ‘ইনসাফ’ সিনেমার ‘আকাশেতে লক্ষ তারা ২.০’, যার হাত ধরে প্লেব্যাকে প্রত্যাবর্তন ঘটে মিলা ইসলামেরÑ বাংলা গানের ২.০ সংস্করণ যে হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের জন্যও নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে, এটি ছিল তার প্রমাণ।
চলচ্চিত্র সংগীতে প্রীতম হাসানের বছরজুড়ে আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। ‘বরবাদ’ সিনেমার ‘চাঁদ মামা’, যেখানে তার সঙ্গে কণ্ঠ দিয়ে আলোচনায় আসেন অদিতি রহমান দোলা। একই সিনেমার আরও দুই গান ‘মহামায়া’ (মাইনুল আহসান নোবেল) ও ‘মায়াবী’ (ইমরান-কোনাল) শ্রোতার প্লেলিস্টে স্থায়ী আসন পায়। বছরের আরেক আলোড়ন ছিল ‘জ্বিন-৩’ সিনেমার ‘কন্যা’ (ইমরান-কনা) এবং ‘জংলি’ সিনেমার ‘বন্ধুগো শোন’Ñ যার কথা ও সুর করেন প্রিন্স মাহমুদ। তার সুরে ‘জংলি’ সিনেমায় নিরীক্ষা-বিপ্লব না ঘটলেও মাহতিম সাকিবের ‘মায়া পাখি’, হাবিবের ‘যদি আলো আসতো’, তাহসান-আতিয়ার ‘জনম জনম’ আলাদা করে শ্রোতার দৃষ্টি পায়।
কিন্তু সিনেমার তুলনায় নাটক ও সিরিজের গান প্রত্যাশা অনুযায়ী সাড়া তুলতে পারেনিÑ জনপ্রিয়তার বিচারে কম গানই আলোচনায় আসে। সংখ্যা কম না হলেও প্রভাব ছিল সীমিত। তবু কিছু গান এই গণ্ডি ভেঙে অনুরণন তুলেছেÑ বালাম-ন্যান্সির ‘মায়া মায়া লাগে’, ইমরান-কনার ‘আমি শুধু তোমার হবো’, পড়শী-আভরাল সাহিরের ‘হৃদয়ের এক কোণে’, আরফিন রুমি-পড়শীর ‘ঘুম হয়ে যা’, রেহান রসুল-অবন্তীর ‘এত প্রেম এত মায়া’। এসব গান ডিজিটাল শ্রোতার হৃদয়-স্মৃতিতে আলাদা ছাপ ফেলে।
মূলধারার বাইরে ২০২৫ সমৃদ্ধ ছিল অনলাইন সংগীত আয়োজন, বিশেষত কোক স্টুডিও বাংলা, যেখানে রুনা লায়লার ‘মাস্ত কালান্দার’, হাবিব-মেহেরনিগরের ‘মহাজাদু’, তানজির তুহিন-লিভিয়া-গাব্বুর ‘ক্যাফে’, ইমন-হাসিম মাহমুদের ‘বাজি’ বছরের অন্যতম আলোচিত গান হয়ে ওঠে। মিষ্টি কণ্ঠের গায়িকী দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করা সংগীতশিল্পী মৌমিতা তাশরিন নদীর একক গান ‘তুমিহীনা’ ছিল আলোচনায়। আরটিভি ফোক স্টেশন, লাইভ সেশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল আয়োজনে প্রকাশিত গান শ্রোতার প্রত্যাশা পূরণ করে, আর স্বতন্ত্র অডিও-ভিডিও গানের মধ্যে প্রায় গান জনপ্রিয়তার তালিকায় জায়গা নেয়Ñ যার শীর্ষে ছিল কোনাল-নিলয়ের ‘ময়না’ ও সানজিদা রিমির ‘তুই আমার আলতা চুড়ি না’।