প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৪ পিএম
সম্প্রতি শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশের সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে গভীর শোক সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় শিল্পী ও শোবিজ ব্যক্তিত্বরা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন তাদের সমবেদনা ও শ্রদ্ধা। অভিনেত্রী নুসরত ইমরোশ তিশা লিখেছেন, ‘শহীদ ওসমান হাদি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে থাকবেন।’ অভিনেতা সিয়াম আহমেদ ওসমান হাদির সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করে বলেছেন, ‘যে সর্বোচ্চ ত্যাগে জীবন দেয়, সে কখনও হারায় না।
’তরুণ অভিনেতা আরশ খান লিখেছেন, ‘একটা একটা করে নিভে যাওয়া বাতিÑ সবাই দেশের অংশ ছিল। কোনো না কোনো মায়ের সন্তান ছিল। একদিন জিতে যাবে ক্ষমতা, কিন্তু দেখবে পৃথিবীটাই থেমে গেল।অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক বলেছেন, হাদি কোনো এমপি-মন্ত্রী ছিলেন না, সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায় করেননি। তবু সামান্য কথার দায়ে তার জীবন শেষ হলো। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভিন্নমত মানেই কি শাস্তি? আজ হাদি, কাল কে?
মডেল ও অভিনেত্রী পিয়া জান্নাতুল পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে লিখেছেন, ‘আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন এবং শোকাহত পরিবারকে ধৈর্য ও সান্ত্বনা দেন।’ তিনি যোগ করেছেন, আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে রাজনীতি হবে মানবিক, দায়িত্বশীল, আর মানুষের জীবন মূল্যবান থাকবে।শহীদ ওসমান হাদির জীবন ও আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা জীবনের চেয়ে বড় নয়, প্রকৃত দেশপ্রেম ও ন্যায়বিচার মানবিকতার আলোয় প্রকাশ পায়।
চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুন তার টুইট পোস্টে লিখেছেন, ‘ওসমান হাদি শান্তিতে ঘুমান, তাকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু লড়াই থামবে না।’ তিনি ন্যায়ের ডাক দিয়েছেন এবং বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
অভিনেতা নিলয় আলমগীর বলেছেন, ‘হাদি সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন এবং তার আত্মত্যাগের মর্ম আমাদের মনে থাকবে।’ অভিনেতা নাসির উদ্দিন খান শোক প্রকাশ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শান্তি কামনা করেছেন।
তবে হাদির মৃত্যুতে উদ্ভূত সহিংসতা ও নৈরাজ্যও সমানভাবে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদের নামে জ্বলে উঠেছিল আগুন, ভেঙে পড়েছিল সংবাদপত্রের ভবন, সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতীকী স্থানগুলো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানটÑ এই নামগুলো সেই রাতে আর কেবল প্রতিষ্ঠান ছিল না, হয়ে উঠেছিল সহিংস উন্মাদনার নীরব সাক্ষী। শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুকে ঘিরে যে হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে আমাদের প্রতিবাদের ভাষা, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা এবং সাংস্কৃতিক সহনশীলতার ভবিষ্যৎ। এই অন্ধ ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের কণ্ঠে উঠে এসেছে একটাই দাবিÑ ন্যায়বিচার হোক, কিন্তু সহিংসতা নয়।
সংগীতশিল্পী কনক চাঁপা সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নৈরাজ্যের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি তার নিজস্ব ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ওসমান হাদি তার জীবদ্দশায় বারবার বলতেন, ‘আমি আমার শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করতে চাই।’ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জবাবে তিনি ধ্বংস নয়, বরং ভালো সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ তার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় যারা শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালিয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ডে ফুটে উঠেছে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার নগ্ন রূপ। অনেকের কাছেই প্রশ্নÑ এই নৈরাজ্য কার স্বার্থে, কাদের উস্কানিতে?
এই প্রেক্ষাপটে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে পুড়ে যাওয়া প্রথম আলোর ভবনের ছবি পোস্ট করে অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ লিখেছেন, ‘এই কয়েকটি দেওয়ালে আগুন দিয়ে কিছু কলঙ্ক ছাড়া বেশি কিছু অর্জিত হবে না।’ তার এই মন্তব্যে একমত পোষণ করেছেন বহু সংবাদকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মী, যারা মনে করেন, মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তার জবাব আগুন দিয়ে নয়।
ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাদিয়া আয়মানও স্পষ্ট ভাষায় সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তিনি লিখেছেন, হত্যাকারীদের বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা আইন ও ন্যায়বিচারের পথেই। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার প্রসঙ্গে তার প্রশ্ন, ‘প্রতিবাদের নামে যারা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করল, তারা কি বুঝল যে তারা নিজেদেরই সম্পদ ধ্বংস করছে?’
একই সুরে কথা বলেছেন অভিনেতা খায়রুল বাসার। প্রথম আলোর পাঠক সংগঠন বন্ধুসভা পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় তিনি লিখেছেন, সহিংসতা কখনোই ন্যায্য নয়। বন্ধুসভার কাজের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, এই সংগঠন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভালো মানুষ হওয়ার চর্চা আর একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন লালন করে। আগুনে সেই স্বপ্ন পুড়লেও আদর্শ পুড়ে যায় নাÑ এই বিশ্বাস থেকেই তার উচ্চারণ, ছায়ানট ভেঙে গান থামবে না।