প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৪ পিএম
আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:২৩ পিএম
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি এ দেশের মানুষের চেতনা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। স্বাধীনতার পর থেকেই এই যুদ্ধের গল্প, বেদনা, সাহস ও আত্মত্যাগ বারবার ফিরে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্রে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধকে কখনও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনও যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজে, আবার কখনও প্রতীকী বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পর্দায় তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এসব চলচ্চিত্র একদিকে যেমন ইতিহাসকে ধারণ করেছে, অন্যদিকে তেমনই দেশের মানুষের মানসিক অবস্থান ও পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতাকেও তুলে ধরেছে। বিজয়ের এই মাসে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন।
ওরা ১১ জন
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ (১৯৭২)। পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম সদ্যস্বাধীন দেশের আবেগ ও বাস্তবতাকে পর্দায় ধারণ করেন। ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছে ১১ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে ঘিরে, যারা প্রশিক্ষণ নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, বন্ধুত্ব, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগÑ সবকিছুই সরল ভাষায় উঠে এসেছে ছবিটিতে। এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রযাত্রার একটি ঐতিহাসিক দলিল।
আবার তোরা মানুষ হ
১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ‘আবার তোরা মানুষ হ’। পরিচালক খান আতাউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজের ভাঙন, হতাশা ও মানবিক সংকটকে তুলে ধরেন এই ছবিতে। যুদ্ধ শেষ হলেও মানুষের ভেতরের যুদ্ধ যে শেষ হয় না, সেই বোধই ছবিটির মূল বক্তব্য। খান আতাউর রহমান ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, অভিনেতা ও পরিচালকÑ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে যার অবদান বহুমাত্রিক।
একাত্তরের যীশু
মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন আবহে ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩)। নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত এই ছবিতে এক সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এখানে ‘যীশু’ চরিত্রটি হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে ধারাবাহিক ও সাহসী নির্মাতা হিসেবে পরিচিত।
আগুনের পরশমণি
হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪) মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়েছে একেবারে ঘরোয়া ও মানবিক চোখে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি পরিবার, যাদের জীবনে যুদ্ধ আসে নীরবে কিন্তু গভীরভাবে। হুমায়ূন আহমেদ তার সাহিত্যিক ভাষা ও আবেগ দিয়ে যুদ্ধের ভেতরকার মানুষের ভয়, আশা ও ভালোবাসাকে পর্দায় জীবন্ত করেছেন।
গেরিলা
দীর্ঘ সময় পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় নতুন মাত্রা যোগ করে ‘গেরিলা’ (২০১১)। আবারও পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তবে এবার গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে নারী মুক্তিযোদ্ধারা। ঢাকা শহরের গেরিলা অপারেশনে অংশ নেওয়া নারীদের সাহস, ঝুঁকি ও আত্মত্যাগ ছবিটিকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীদের অবদানকে নতুন করে সামনে আনে।
দামাল
সবশেষ সাম্প্রতিক সংযোজন ‘দামাল’ (২০২২)। পরিচালক রায়হান রাফী মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ফুটবলকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একদল তরুণ ফুটবলারের দেশপ্রেম, লড়াই ও সাহসের গল্প বলেছে এই সিনেমা। সমকালীন নির্মাণশৈলী ও তরুণদের আবেগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস দেখা যায় এতে।