গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৫:০৯ পিএম
সামাজিক মাধ্যমে গত কয়েক দিন ধরেই দেশের পরিচিত নারী তারকাদের পোস্টে অদ্ভুত সব সংখ্যা ভেসে উঠছে। কারও ছবির কোণে ‘৯’, কারওটায় ‘২৪’, আবার কারও পোস্টে দেখা যাচ্ছে ‘১০০০’Ñ হঠাৎ এসব সংখ্যার বন্যা দেখে নেটিজেনদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে, এর মানে কী? কেন সবাই হঠাৎ একই ধাঁচের পোস্টে ব্যস্ত?
শেষ পর্যন্ত উন্মোচিত হয়েছে সেই রহস্য। জানা গেছে, এটি আসলে ডিজিটাল সহিংসতা ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে তারকাদের যৌথ প্রতিবাদ। তারা যুক্ত হয়েছেন একটি নতুন সচেতনতামূলক অভিযানে, যার নাম ‘মাই নম্বর, মাই রুলস’। নিজেদের ছবির ওপর যে সংখ্যাটি তারকারা লিখছেন, সেটি প্রতীকীভাবে জানিয়ে দিচ্ছে- প্রতিদিন গড়ে কতবার তারা অনলাইনে অবাঞ্ছিত মন্তব্য, কটূক্তি কিংবা সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হন। গত ২৫ নভেম্বর এই আন্দোলনের সূচনা করেন অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। নিজের ছবিতে ‘৯’ লিখে তিনি জানান, প্রতিদিন অন্তত ৯ বার তিনি অনলাইনে হয়রানির শিকার হন। এ প্রসঙ্গে তিশা লেখেন, ‘সংখ্যা থেকে কণ্ঠস্বর, আসুন আমাদের গল্প সবার সামনে তুলে ধরি। তোমার নম্বরের গল্প বলো, আরও জোরে আওয়াজ তোলো। মানুষ হয়তো কেবল একটি সংখ্যা দেখতে পারছেন, কিন্তু আমি যা সহ্য করেছি এবং যা কাটিয়ে উঠেছিÑ তার সবই দেখতে পাচ্ছি।’ তিশার পর এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন শোবিজের আরও অনেক নারী তারকা। অভিনেত্রী রুনা খান তার ছবিতে লিখেছেন ‘২৪’, অর্থাৎ দিনে ২৪ বার তিনি বুলিংয়ের শিকার হন। শবনম ফারিয়ার ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি আঁতকে ওঠার মতো, ‘১০০০’। এ ছাড়া প্রার্থনা ফারদিন দিঘী ‘৩’, মৌসুমী হামিদ ‘৭২’, সাজিয়া সুলতানা পুতুল ‘৯’ এবং আশনা হাবিব ভাবনা ‘৯৯ প্লাস’ লিখে নিজেদের হয়রানির পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেত্রী রুনা খান। তিনি বলেন, ‘শুধু তারকা নয়, যেকোনো নারীই সামাজিক মাধ্যমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গত দশ বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়া যত দ্রুত মানুষের হাতে পৌঁছেছে, তার সঠিক ব্যবহারবিধি অনেকেই শেখেনি।’
রুনা খান আরও যোগ করেন, ‘নারীরা কখনোই শতভাগ নিরাপদ ছিলেন না। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা প্রতিনিয়ত হয়রানি, অপমান ও কটূক্তির সম্মুখীন হচ্ছেন।’ আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, ডিজিটাল সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ‘মাই নম্বর, মাই রুলস’ শীর্ষক এই অনলাইন ক্যাম্পেইনটি টানা ১৬ দিন চলবে।
এর আগে রিউমার স্ক্যানারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছিল, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই ৯ মাসে যত গুজব শনাক্ত হয়েছে তার অন্তত ২১ শতাংশ নারীদের ঘিরে। বাংলাদেশে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো ভুয়া তথ্য বা অপতথ্যের অন্যতম বড় শিকার হয়ে ওঠছেন বিনোদন জগতের নারীরা। অভিনেত্রী, মডেল, উপস্থাপক ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের নাম-পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট কিংবা মৃত্যুর গুজব।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিনোদন জগতের ২৯ জন নারী তারকাকে জড়িয়ে অন্তত ৬৮টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। এর মধ্যে ৫০টি কনটেন্টের ক্ষেত্রে এআই বা ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। বিনোদন জগতে চলতি বছর একের অধিক অপতথ্যের শিকার হয়েছেন এমন তারকাদের মধ্যে আছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা, মেহের আফরোজ শাওন, আজমেরী হক বাঁধন, প্রার্থনা ফারদিন দীঘি, তানজিম সাইয়ারা তটিনী, বিদ্যা সিনহা সাহা মীম, তাসনিয়া ফারিণ, মাহিয়া মাহি, শবনম বুবলী, অপু বিশ্বাস, পরীমনি, নাজনীন নাহার নিহা, রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা, মেহজাবীন চৌধুরী ও শবনম ফারিয়া। নারীকে নিয়ে অপতথ্য, অপমান ও কটূক্তি যেন নিয়মিত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এবার ডিজিটাল সহিংসতা ও সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে তারকাদের যৌথ প্রতিবাদ জনসচেতনতায় বেশ সাড়া ফেলেছে। বিনোদন-সংশ্লিষ্ট সবাই এমনটাই মনে করছেন।