প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৫০ পিএম
সময়টা গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। কিউবার ট্রাম্পেটবাদক মারিও বাউজা ও তাঁর ব্যান্ড মাচিতো অ্যান্ড দ্য আফ্রো-কিউবানস নিউইয়র্কের নাচঘরে প্রথমবার জ্যাজের হারমনি ও কিউবার সন মনতুনো ছন্দ মেলালেন। সেখান থেকেই শুরু এক দীর্ঘ সংগীত বিপ্লব, আফ্রো-কিউবান জ্যাজ।
আফ্রিকা, ক্যারিবীয় ও আমেরিকার সংগীত যখন একসাথে কথা বলতে শুরু করল, তৈরি হলো এক নতুন ছন্দভাষা। কঙ্গা, টিম্বালেস, ট্রাম্পেট আর সিঙ্কোপেটেড পিয়ানো সব মিলিয়ে এই সংগীত ছিল জ্যাজের নিখুঁত ও ট্রপিক্যাল জীবনের স্পন্দন। এরপর এডি পালমিয়েরি ও টিটো পুয়েন্তের মতো শিল্পীরা এই ধারাকে জনপ্রিয় করে তুললেন। ছোট ছোট ক্লাবের সুর হয়ে উঠল বৈশ্বিক ছন্দের ভাষা।
সময়ের সাথে এই ছন্দ দক্ষিণ এশিয়ার মত দূর দেশে পৌঁছে গেল । তবে এই যাত্রা হঠাৎ নয়। বিশ্বায়ন, ভ্রমণ আর অভিবাসনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সংগীতের কৌতূহলও। লন্ডন, ঢাকা, কলকাতা, করাচি সব জায়গাতেই কিছু সুরকার খুঁজে পেয়েছেন ল্যাটিন জ্যাজের ছন্দ। ক্লাভে, মোনতুনো পিয়ানো, আর বাতাসে দুলতে থাকা ট্রাম্পেট, এসবই টেনেছে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতশিল্পীদের।
রাগ, বাউল, বা বাংলা লোকসুরে যাঁরা বড় হয়েছেন তাঁদের কাছে এই নতুন ছন্দ মানে এক নতুন ক্যানভাস। যেখানে তবলা কথা বলে কঙ্গার সঙ্গে, সরোদ মিশে যায় ট্রাম্পেটের সুরে, আর শাস্ত্রীয় সুর ভাসে আফ্রো-ল্যাটিন রিদমের ওপরে।
গত কয়েক দশকে নানা ফিউশন সংগীত এই দুই মহাদেশের সেতুবন্ধন ঘটিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার পপ সংগীতেও ঢুকে পড়েছে সালসা অনুপ্রাণিত যন্ত্র ও ছন্দ। এগুলো মোটেই নকল ছিল না, বরং ছিল সম্পূর্ণ নতুন কম্পোজিশন যেখানে ল্যাটিন জ্যাজের মূল ছন্দ স্থানীয় সুরের স্পর্শ পেয়েছে । কারণ, সুর আসলে সর্বজনীন। “ক্লাভে” শব্দটা না জানলেও মানুষ তার স্পন্দন অনুভব করতে পারে ঠিক যেমনি বাউলের একতারা বা ঢোলের তালে শরীর নিজে থেকেই দুলে ওঠে।
এই সংযোগের নতুন অধ্যায় দেখা গেল কোক স্টুডিও বাংলার সাম্প্রতিক গান ক্যাফে-তে। গানটির মূল অনুপ্রেরণা এডি পালমিয়েরির স্প্যানিশ সৃষ্টিতে যা পরে মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের হাতে নতুন রূপ পেয়েছিল । এবার সেই গান ফিরে এসেছে এক নতুন আঙ্গিকে—একাকীত্ব ও নীরবতার ধ্যান হিসেবে।
বাংলাদেশের রকস্টার তানজির চৌধুরী তুহিন এবং গৌতমের ছেলে গৌরব “গাবু” চট্টোপাধ্যায় মিলে নতুন করে বলছেন সেই গল্প। তাঁদের সঙ্গে আছেন ব্রাজিলের শিল্পী লিভিয়া মাতোস যিনি গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে ল্যাটিন উষ্ণতা এনেছেন । তাঁর সুরে ঝরে পড়েছে পালমিয়েরির আফ্রো-কিউবান ছন্দের প্রতিধ্বনি।
গানটির প্রযোজক শুভেন্দু দাস শুভ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গানটির কম্পোজিশন তৈরি করেছেন। পারকাশন আর ব্রাসের ছোঁয়ায় মৃদু বাংলা কণ্ঠের ভেতরে পাওয়া গেছে হালকা ল্যাটিন দোল। তবু গানটি নিজের আবেগ হারায়নি। এটা ল্যাটিন জ্যাজের অনুকরণ নয় বরং এক শান্ত সংলাপ যেখানে ঢাকা মিশেছে হাভানার সঙ্গে, কিন্তু নিজের আত্মা বজায় রেখেছে।
এ ধরনের ফিউশনের সাফল্য আসে সংযম থেকে। দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পীরা ল্যাটিন জ্যাজকে অনুকরণ করেন না, কথা বলেন তার সঙ্গে। তবলা হয় বংগোর বিকল্প, হারমোনিয়াম নেয় ট্রাম্পেটের উষ্ণতা, আর বাংলা সুর রয়ে যায় নিজের কবিতার ভেতরেই—যদিও ছন্দ হয় সিঙ্কোপেটেড।
তবে চ্যালেঞ্জও আছে। ল্যাটিন রিদমের জটিলতা সম্পর্কে আমাদের মূলধারার সংগীতে জ্ঞান এখনো সীমিত। বড় আকারের ব্যান্ড আয়োজন বা যন্ত্রপাতির জোগানও সহজ নয়। তবু কোক স্টুডিওর মতো প্ল্যাটফর্ম প্রমাণ করছে পরিচয় হারানো ছাড়াই ল্যাটিন অনুপ্রাণিত আয়োজন দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই সংলাপের মানে আরও গভীর। এটা বাংলা সংগীতকে যুক্ত করছে এক বৈশ্বিক ছন্দ ঐতিহ্যের সঙ্গে যেখানে আছে তাৎক্ষণিক সৃষ্টির স্বাধীনতা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন, আর মানবতার সুর। ক্যাফের মতো একটি গান যখন অনায়াসে হাভানা থেকে ঢাকা পর্যন্ত যাত্রা করে, তখন সেটা অনুকরণ নয়, এক বিবর্তন।
হাভানার ধোঁয়াটে ক্লাব থেকে ঢাকার ডিজিটাল স্টুডিও পর্যন্ত আফ্রো-কিউবান জ্যাজের এই যাত্রা দেখিয়ে দেয় ভালো সংগীতের কোনো সীমানা নেই। এটা পাসপোর্ট বা বাণিজ্যপথে ভ্রমণ করে না বরং ঘুরে বেড়ায় হৃদয়ের ছন্দে যেখানে মানুষ একে অপরকে শুধু স্পন্দনের মাধ্যমে চিনে ফেলে ।