আজ জেমসের জন্মদিন
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৪৭ এএম
মাহফুজ আনাম জেমস
জেমস নামটি উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে এক অনন্য রকস্টারের প্রতিচ্ছবি। তার কণ্ঠে সুর মিশলেই রাত জাগে হাজারো তরুণ-তরুণীর, আর কোনো উৎসব যেন পূর্ণতা পায় কেবল তার উপস্থিতিতে। আজ সেই কিংবদন্তির ৬১তম জন্মদিন। তিনি নগর বাউল ব্যান্ডের প্রাণপুরুষ, ভোকালিস্ট মাহফুজ আনাম, যিনি জেমস নামেই গোটা উপমহাদেশে পরিচিত।
তার কৈশোরের উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে। বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ফিলিংস আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার সংগীতযাত্রা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম স্টেশন রোড দিয়েই সাড়া ফেলেন তিনি, যা পরবর্তীতে রক সংগীতে এনে দেয় নতুন ধারা। ১৯৮৮ সালে আসে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’। পরবর্তীতে ‘ফিলিংস’-এর নাম পরিবর্তন করে দেন ‘নগর বাউল’। জেমসের ব্যান্ড ও একক অ্যালবামের মধ্যে আরও রয়েছেÑ লেইস ফিতা লেইস, নগর বাউল, দুষ্টু ছেলের দল, পালাবে কোথায়, দুঃখিনী দুঃখ করো না, আমি তোমাদেরই লোক ও কাল যমুনা।
বাংলাদেশি সিনেমায় জেমসের গান বেশ জনপ্রিয়। দুবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। শুধু দেশীয় প্লেব্যাক নয়, বলিউডেও রাজত্ব করেছেন এই রক তারকা। তার গাওয়া ভিগি ভিগি, চাল চালে, আলবিদা, রিশতে এবং বেবাসি গানগুলো এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয়। জেমসের গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ তারায় তারায়, লেইস ফিতা লেইস, সুলতানা বিবিয়ানা, সুস্মিতার সবুজ ওড়না, হতেও পারে এই দেখা শেষ দেখা, কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী, দুষ্টু ছেলের দল, দিদিমনি, দুঃখিনী দুঃখ করোনা, তোর সব কিছুতে নয় ছয়, বাবা কত দিন দেখি না তোমায়, গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া, লিখতে পারি না কোনো গান, এক নদী যমুনাসহ অসংখ্য গান।

ঘর ছেড়ে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং, সেখান থেকেই শুরু এক অদ্ভুত যাত্রা। নামহীন অনুভূতির টানে গড়া ফিলিংস, সেখান থেকে ঢাকার কোলাহল আর তারপর বলিউডের ঝলমলে পর্দা। সাদা পাঞ্জাবি, নীল জিনস, ভ্রুতে পিয়ার্সিং- নব্বই দশকের সাইকেডেলিক রকস্টারের প্রতীক হয়ে ওঠা সেই তরুণ আজ আধপাকা দাড়ির কিংবদন্তি, ফারুক মাহফুজ আনাম- আমাদের চেনা জেমস।
রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা কিংবা জীবনানন্দের রূপসী বাংলার বাইরে পা বাড়ালেও মনের গভীরে তিনি থেকে গেছেন এ মাটির মানুষ। তার সুরে বারবার উঠে এসেছে এই বাংলার প্রাণ, এই নদী-খাল, এই শহর-গ্রামের গল্প। বিদেশের স্টেজে দাঁড়ালেও দর্শকসারি হয়ে ওঠে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিচ্ছবি।
কনসার্ট ছাড়া তাকে দেখা যায় না কোথাও; সামাজিক মাধ্যমে উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবুও জেমস একাই ভরিয়ে রাখেন অগণিত শ্রোতার মন। এমন বোহেমিয়ান স্বভাবের মানুষকেও যে এতটা ভালোবাসা যায়, সেটাই এক বিস্ময়। তার প্রতিটি কণ্ঠধ্বনি শ্রোতাকে শিহরিত করে, ভাবতে শেখায়, আবার প্রশান্তিও দেয়।

বাংলা গানে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলা এই মানুষটি এখনও তরুণ প্রজন্মকে দেখাচ্ছেন স্বপ্ন- যেখানে সংগীত কেবল বিনোদন নয়, বরং মুক্তির আরেক নাম। প্রজন্মের পর প্রজন্মে ধ্বনিত হচ্ছেন তিনি, ধ্বনিত হচ্ছে তার গান। তার গানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীÑ সবাই তার গানকে আপন করে নিতে পারেন। তাই তো একসঙ্গে গলা মিলিয়ে তরুণরা গেয়ে ওঠেন, ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, তুমি আমার।’ অথবা ‘চোরা সুরের টানে রে বন্ধু/ মনে যদি ওঠে গান/ গানে গানে রেখো মনে/ ভুলে যেয়ো অভিমান...।’
জেমস মানে উন্মাতাল সুর, ‘সিনায় সিনায় লাগে টান’। জেমস আমাদের নগরবাউল এবং ভক্তদের ‘গুরু’। বাংলাদেশের ব্যান্ডের এই মহাতারকার ভাষায়, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। কিন্তু মঞ্চে উঠলে তিনি যতটা কাছের, মঞ্চ ছাড়তেই ততটা দূরের তারা।