প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৭ পিএম
সালমান শাহ
ঢালিউডে প্রথম সিনেমা দিয়েই দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছিলেন প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ। ক্যারিয়ারে মাত্র ছয় বছরেই বাজিমাত করেন তিনি। আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ক্ষণজন্মা এই নায়কের শুভ জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ ৫৫ বছরে পা রাখতেন সালমান শাহ। ১৯৭১ সালে আজকের এই দিনে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন তিনি। ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে সিনেমায় অভিষেক হয় সালমানের। এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন মৌসুমী।
ক্যারিয়ারে মোট ২৭টি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ। আর সব সিনেমাই ছিল ব্যবসাসফল। পাশাপাশি সালমান শাহ-শাবনূরের জুটিও দর্শকদের ভীষণ প্রিয় ছিল। নব্বই দশকে দর্শক যখন বাংলা ছবির নায়কদের যাত্রাপালার মতো একই ধাঁচের পোশাকে দেখে বিরক্ত হয়ে গেছে, তখন সালমান এই প্রচলিত ধারার বিপরীতে পোশাক-আশাকে নিয়ে এলেন আধুনিকতার ছোঁয়া। কখনও হ্যাট ও লম্বা কোটে পশ্চিমা লুক কিংবা টি-শার্ট বা লং শার্টের সঙ্গে নানা রকমের পশ্চিমা কোট থেকে শুরু করে স্যুট-টাই পরে কেতাদুরস্ত। কখনও শার্টের কলার উঠিয়ে কিংবা হাফহাতা গেঞ্জি, জিন্স ওপরের দিকে ভাঁজ, হুডি-শার্ট কখনও ইন করে আবার ওপেনে রেখে বিচিত্র লুকে আবার কাউবয় বা জমিদারি পোশাকে, কবি-সাহিত্যিকের প্রতীকী পাঞ্জাবি পরেÑ পর্দায় হাজির হতে দেখা গেছে সালমানকে। হাফহাতা পলো টি-শার্টের হাতা ভাঁজ করে পরা সালমান শিখিয়েছেন। ব্যাকব্রাশ করা চুল, কানের দুল, রংবেরঙের টুপি, সানগ্লাস, ফেড জিনস, মাথায় স্কার্ফÑ কত স্টাইল যোগ করলেন সালমান।
তার অভিনয় ও স্টাইলে এখনও মুগ্ধ বর্তমান প্রজন্মের দর্শকরা। ক্যারিয়ারের সময়সীমা স্বল্প সময়ের, আর তাতেই হয়েছিলেন খ্যাতিমান। নব্বইয়ের শুরুতে দেশের সিনেমা অঙ্গনকে দেখিয়েছিলেন নতুন দিশা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সালমান হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে ব্যস্ত ও সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নেওয়া অভিনেতা।
১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেট শহরে দাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন সালমান শাহ। তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। তার প্রকৃত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। কিন্তু চলচ্চিত্র অঙ্গনে সালমান শাহ নামেই পরিচিত তিনি। পরিবারে দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন বড় ছেলে। খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু সালমান শাহর। একই স্কুলে তার সহপাঠী ছিলেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী। ১৯৮৭ সালে রাজধানীর ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন জনপ্রিয় এই নায়ক। পরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ (বর্তমান ডক্টর মালিকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) থেকে বিকম পাস করেন সালমান শাহ।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। প্রিয় তারকার মৃত্যুর খবরে মুহূর্তেই অন্ধকার নেমে আসে দেশজুড়ে। থমকে যায় সব কলরব। কেউ মেনেই নিতে পারছিলেন না যে, সালমান শাহ আর আমাদের মাঝে নেই। সালমান শাহর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে ঢাকাই চলচ্চিত্রেও। কেন এমন পথ বেছে নিলেন তিনি? এই প্রশ্ন আজও তাড়া করে বেড়ায় তার ভক্ত-অনুরাগীদের। সালমান শাহর মৃত্যুর কারণটি আজও রহস্যই রয়ে গেছে। সালমান শাহ ১৯৮৫ সালে বিটিভির ‘আকাশ ছোঁয়া’ নাটক দিয়ে অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেন।
নয়ন নাটকটি সে বছর শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘পাথর সময়’ ও ১৯৯৪ সালে ‘ইতিকথা’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন।
সালমান শাহ অভিনীত শেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘বুকের ভেতর আগুন’। ছটকু আহমেদ পরিচালিত সিনেমাটিতে সালমানের বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন শাবনূর। সিনেমাটির জন্য এ অভিনেতা নিয়েছিলেন সে সময়ের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক, দুই লাখ টাকা, এমনটাই জানিয়েছেন পরিচালক ও সিনেমাটির প্রযোজক ছটকু আহমেদ। তবে এ সিনেমার কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারেননি সালমান। গল্পের কিছুটা পরিবর্তন এনে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় ফেরদৌস আহমেদকে। সালমানের মৃত্যুর এক বছর পর সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এই সিনেমা দিয়েই শেষ হয় সালমানের সেলুলয়েড সফর। মৃত্যুর ঠিক এক সপ্তাহ পর ১৩ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ছটকু আহমেদের পরিচালিত ‘সত্যের মৃত্যু নেই’। নির্মাতাদের পরিকল্পনা ছিল সালমানের জন্মদিনের ছয় দিন আগে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার এবং সেটাই হয়েছিল। কিন্তু সিনেমা মুক্তির আগেই না ফেরার দেশে চলে যান নায়ক। সালমানের মৃত্যুর পর এক বছর পর্যন্ত মুক্তি পেতে থাকে তার অভিনীত ছবিগুলো। ১৯৯৭ সালে সালমানের একেকটা ছবি মুক্তি পাওয়া মানেই ছিল প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় আর সিনেমা শেষে ভেজা চোখে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসা।
সালমান শাহর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সিনেমা হলোÑ ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভেতর আগুন’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘স্নেহ’, ‘দেন মোহর’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘মায়ের অধিকার’ এবং ‘প্রিয়জন’।