প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৫ ১৩:০২ পিএম
ফরিদা আক্তার ববিতা
রুপালি পর্দার অন্যতম অভিনেত্রী ববিতার ৭৩তম জন্মদিন আজ। ১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই বাগেরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যমে ভক্ত-অনুরাগীদের শুভেচ্ছায় ভাসছেন এই অভিনেত্রী। ১৯৬৮ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে জহির রায়হান পরিচালিত ‘সংসার’ সিনেমার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

চলচ্চিত্র জগতে তার প্রাথমিক নাম ছিল ‘সুবর্ণা’। জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ সিনেমাতে অভিনয় করতে গিয়েই তার নাম হয়ে যায় ‘ববিতা’। নায়িকা হিসেবে ববিতার প্রথম সিনেমা ‘শেষ পর্যন্ত’। তার আসল নাম ফরিদা আক্তার পপি। কিন্তু চলচ্চিত্রে আসার পর পরিচিতি পেয়েছেন ববিতা নামে। ক্যারিয়ারে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ববিতার জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় আছে সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’। এর বাইরে উল্লেখযোগ্য আরও সিনেমার মধ্যে আছে- টাকা আনা পাই, স্বরলিপি, বাঁদি থেকে বেগম, লাঠিয়াল, আলোর মিছিল, সূর্যগ্রহণ, নয়নমণি, গোলাপী এখন ট্রেনে, গোলাপী এখন ঢাকায়, কি যে করি, এক মুঠো ভাত, অনন্ত প্রেম, বসুন্ধরা, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, স্বপ্নের পৃথিবী, মায়ের অধিকার, জীবন সংসার, দীপু নাম্বার টু, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, এখনো অনেক রাত, ম্যাডাম ফুলি, হাছন রাজা, চার সতীনের ঘর ইত্যাদি।

১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের পর টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন রুপালি পর্দার এই অভিনেত্রী। এ ছাড়া ২০১৬ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। চিরসবুজ কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর জানা অজানা কিছু দিক চলুন জেনে নেওয়া যাক।
শুটিং দেখার শখ ছিল তার। কিন্তু সিনেমায় অভিনয় করার ভাবনা কখনও মাথায় আসেনি। প্রথম নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘চাওয়া পাওয়া’ ছবির শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সিনেমায় অভিনয় করার ইচ্ছা তার কখনোই ছিল না। পরিচালক জহির রায়হানের ‘সংসার’ সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও প্রথমে রাজি হননি। পরে মা আর বোনের পীড়াপীড়িতে অভিনয় করেন। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন। ছবিটি সুপারফ্লপ হয়। মা ছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। ববিতা ছিলেন তার সহকারী। তার নিজেরও ইচ্ছা ছিল মায়ের মতো চিকিৎসক হওয়ার। পয়সা জমিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে সিনেমা দেখতেন। স্কুল ফাঁকি দিয়ে প্রথম সিনেমা দেখেন গুলিস্তানের নাজ সিনেমা হলে ‘হোটেল সাহারা’। পরিচালক জহির রায়হান আবারও ‘জ্বলতে সুরজ কে নিচে’ উর্দু সিনেমার নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করতে বললে প্রথমে যথারীতি রাজি হননি। তখন বয়স মাত্র ১৪। কিন্তু ছবির বেশিরভাগ শুটিং হওয়ার পরও শিল্পীদের শিডিউল মেলাতে না পারায় সিনেমাটি আর শেষ করা হলো না। এরপর জহির রায়হান তাকে নিয়ে বাংলা সিনেমা বানান।
মুক্তি পর সিনেমাটি সুপারহিট হয়। অভিনয় করার ইচ্ছা না থাকলেও সিনেমা হিট হওয়ায় আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। এরপর ‘স্বরলিপি’, ‘পিচঢালা পথ’, ‘টাকা আনা পাই’, সব সিনেমায়ই ছিল রাজ্জাক-ববিতা জুটি। প্রতিটিই সুপারহিট। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই ববিতার আন্তর্জাতিক সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। অভিনয় করেন সত্যজিৎ রায়ের প্রথম রঙিন সিনেমা ‘অশনি সংকেত’-এ। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা দিয়ে জাতীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। ষাটের দশকে শেষ দিকে অভিনয় শুরু করা ববিতাকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বড় পর্দায় দেখা গেছে। নার্গিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ ছিল তার সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র। এরপর আর কোনো চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি তাকে।
তবে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব যে পাননি তা নয়। কিন্তু ব্যস্ততার পাশাপাশি মনের মতো চরিত্র না পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। সিনেমা নিয়ে এখনও ভাবেন এ অভিনেত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অবসর সময়ে কিন্তু আমার চলচ্চিত্র জীবনের কথা খুব মনে পড়ে। শ্রদ্ধেয় জহির রায়হান ভাই, রাজ্জাক ভাই, ফারুক ভাই, বুলবুল ভাইসহ অনেক সহশিল্পী ও নির্মাতার কথা মনে পড়ে। আমার পরম সৌভাগ্য যে, এদেশের প্রথিতযশা গুণী নির্মাতাদের নির্দেশনায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এমনকি অস্কারজয়ী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতেও কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আসলে অবসরে ফেলে আসার দিনের কত কত কথা যে মনে পড়েÑ তা বলে শেষ করা যাবে না। তবে একজন নায়িকা হিসেবে জীবনজুড়ে আমার যে প্রাপ্তি তাতে ভীষণ সন্তুষ্ট আমি। আমি কৃতজ্ঞ আমার চলচ্চিত্র পরিবারের কাছে। আমাকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করা হলে আমি অবশ্যই অভিনয় করব। অভিনয়কে আমি কখনোই বিদায় বলতে পারি না।’