প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৫ ১১:৩৪ এএম
ঢাকাই চলচ্চিত্র যেন এখন ঈদ নামক উৎসবেই আটকে পড়েছে। প্রতি বছর ঈদ এলেই নতুন সিনেমার ভিড়। প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পীরা যেন মুখিয়ে থাকেন এই দুটো মৌসুমের জন্য- রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদ। শুধু মুক্তি নয়, এখন তো সিনেমা তৈরির পরিকল্পনাও শুরু হয় ঈদ টার্গেট করে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই মুক্তি পেয়েছে ২২টি সিনেমা। এর মধ্যে ১২টিই দুই ঈদে! বাকি সময় প্রেক্ষাগৃহ যেন পড়ে থাকে দর্শকশূন্য, কিংবা সিনেমাশূন্য। কোরবানির ঈদ শেষ হতে না হতেই নির্মাতারা এখন মন দিচ্ছেন আগামী বছরের রোজার ঈদকে ঘিরে। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসেছে কয়েকটি সিনেমার। আবু হায়াত মাহমুদ তৈরি করছেন শাকিব খানকে নিয়ে নতুন ছবি, যেটি মুক্তি পাবে রোজার ঈদে। একই সময়ে মুক্তির জন্য ঘোষণা এসেছে রেদওয়ান রনির ‘দম’ সিনেমার, যেখানে অভিনয় করবেন আফরান নিশো ও চঞ্চল চৌধুরী। একই ঈদে মুক্তি পেতে পারে মেহেদী হাসান হৃদয়ের নতুন সিনেমাও। তবে এই প্রবণতা ভালোভাবে নিচ্ছেন না গিয়াস উদ্দিন সেলিম। ‘মনপুরা’ খ্যাত এই পরিচালক সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেনÑ ‘তাহলে কি ঈদ ছাড়া আর সিনেমা হবে না?’ তার মতো অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীর মধ্যেই প্রশ্ন জাগছে, সারা বছরজুড়ে হলে দর্শক টানতে না পারার দায় কি শুধুই ঈদের ওপর নির্ভরতা?
সিনেমা শুধু উৎসবের বিনোদন নয়, এটি একটি শিল্প- যার নিয়মিত চর্চা প্রয়োজন। ঈদের বাইরেও গল্প, অভিনয় ও নির্মাণে বৈচিত্র্য এনে দর্শককে হলে ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফেসবুকে এই নির্মাতা লিখেছেন, ‘যা যা সিনেমার ঘোষণা আসছে, হয় এই ঈদ, না হয় সেই ঈদ। ঈদ ছাড়া কি সিনেমা হবে না?’
যদিও গিয়াস উদ্দিন সেলিমের সবশেষ সিনেমা ‘কাজলরেখা’ মুক্তি পেয়েছিল গত বছরের রোজার ঈদে। এর আগে কয়েকবার মুক্তির ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত ঈদেই মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মৈমনসিংহ গীতিকার ‘কাজলরেখা’ পালা অবলম্বনে তৈরি এ সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন- শরিফুল রাজ, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, মন্দিরা চক্রবর্তী, আজাদ আবুল কালাম প্রমুখ। মূলত ঈদের সময় দর্শক সমাগম বেশি থাকায় এ উৎসবে সিনেমা মুক্তি দিতে চান নির্মাতা। সিনেপ্লেক্সে গুটি কয়েক শো পেলেও খুশি তারা। তবে সিনেমা হলের মালিকরা চান, বছরজুড়ে নিয়মিত মুক্তি পাক ভালো মানের সিনেমা। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতারাও অভিযোগ করছেন, নিয়মিত সিনেমা মুক্তি না পাওয়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় সিনেমা হল বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকরা।
পরিবেশক, প্রযোজকদের ভাষ্য, দেশের সিনেমা হলগুলোর অধিকাংশই আর টিকে নেই, যে কয়েকটি আছে তাও বছরের বেশিরভাগ সময়ই ফাঁকা পড়ে থাকে। কারণ, বড় বাজেটের আলোচিত সিনেমাগুলো কেবল দুই ঈদে মুক্তি পায়, আর তখনই দর্শক সমাগমে জমজমাট চেহারা ফিরে পায় অল্প কয়েক দিনের জন্য। সিনেমা হল বেঁচে আছে কেবল ঈদ ঘিরে।
বছরের বাকি সময়ে দর্শকসংকটে হলের খরচ তুলতেই হিমশিম খান হল মালিকরা। অধিকাংশ হলেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই, নেই প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগও। এই ঈদনির্ভরতা, অব্যবস্থাপনা আর সংস্কারের অভাবে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে দেশের প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসা। চলচ্চিত্র পরিবেশকরা বলেছেন, বর্তমানে দেশে চালু প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ১৪১টি। এর মধ্যে রয়েছে স্টার সিনেপ্লেক্সের ৭টি শাখা। তবে এটা সংখ্যা সত্যিকার প্রতিচ্ছবি নয়।
কারণ ঈদ ছাড়া সারা বছর ধরে চালু থাকে মাত্র ৬০টি হল। এর মধ্যে ৩০টির বেশি হলে চালানো হয় পুরনো সিনেমা। নব্বই দশকের ‘কাটপিস’ সিনেমা বা শাকিব খানের পুরনো ব্যবসাসফল সিনেমা বেশিরভাগ হলে চলে। দেশের ৭০ শতাংশ হলের অবস্থা করুণ, বেশিরভাগেরই সংস্কার নেই। কোথাও ভাঙা চেয়ার, কোথাও নষ্ট ফ্যান, কোথাও আবার বৃষ্টির পানিতে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিহ, রংপুর, বরিশাল কিংবা সিলেটÑ সর্বত্রই একই দৃশ্য। সিনেমা শুধু উৎসবের বিনোদন নয়, এটি একটি শিল্প- যার নিয়মিত চর্চা প্রয়োজন। ঈদের বাইরেও গল্প, অভিনয় ও নির্মাণে বৈচিত্র্য এনে দর্শককে হলে ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।