বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৩১ পিএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১৮:৪৮ পিএম
এগারো বছর হতে চলল চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর, মাইক্রোবাস চালক মোস্তাফিজুর রহমান, প্রোডাকশন সহকারী মোতাহার হোসেন ওয়াসিম ও জামাল মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ঘটনাটি নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শামসুল হক বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তার সেই ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন সেই দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসের জীবিত সকল যাত্রী ও সরাসরি ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী। তারেক মাসুদের ভাই নাহিদ মাসুদ কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক ই-মেইল বার্তায় পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে সেই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
সেখানে আরও স্বাক্ষর করেছেন ক্যাথরিন মাসুদ, দিলারা বেগম জলি, ঢালী আল মামুন, মনিস রফিক, মো. সাইদুল ইসলাম সাঈদ, মঞ্জুলী কাজী।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ওই দুর্ঘটনায় আহতবৃন্দ এবং নিহত চলচ্চিত্র কর্মীদের স্বজন ক্ষুব্ধ, আশ্চর্য ও মর্মাহত যে দুর্ঘটনার এক দশক পরে, এ ব্যাপারে মাননীয় আদালতে একটি মামলার রায় নিষ্পত্তি হওয়ার পর এবং একটি মামলা এখনও বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এই শিক্ষক ও তার সহযোগী গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে তার ভাষায় একটি ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, বাসের চালক নয়, একটি ভ্যানচালক ও চলচ্চিত্র কর্মীদের গাড়ির চালক ভুল দিকে ছিল বলে সংঘর্ষ হয়েছে। আমরা দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসের জীবিত সকল যাত্রী ও সরাসরি ঘটনার প্রত্যক্ষ্যদর্শী অধ্যাপক হকের বিজ্ঞানের দোহাই দেওয়া মনগড়া ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছি।
দু’বছর আগেও তিনি এই নিয়ে আলোচনা সভা করেছেন ও অনলাইন মিডিয়াতে তার মতবাদ প্রকাশ করেছেন। আমরা তখন কোনো জবাব দিইনি, কারণ যা সত্য তা অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সম্প্রতি তিনি একই মতবাদ আবার শুধু নিজে প্রচার নয়, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি দলের কর্তাব্যক্তিদের মাঝে প্রচারণা ও উস্কানি ছড়াচ্ছেন।
কর্তাব্যক্তিদের একজন এমন মন্তব্য করেছেন, যা শুধু আমাদের কেন, আইনের শাসন ব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। আমরা মনে করি এহেন একজন ব্যক্তি বিশেষের মতবাদকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস মালিক শ্রমিক নেতাদের মতো স্বার্থান্বেষী মহলের মদদপুষ্ট।
ঘটনাস্থলের যে ছবি, ভিডিও এবং অডিওর কথা উল্লেখ করে তিনি তার মতবাদ জোরালো করেছেন, এগুলো সবই দুর্ঘটনার দিন থেকে জনগণের কাছে উন্মুক্ত। দুর্ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ছিল না, কাজেই ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী এবং গাড়ির জীবিত যাত্রীবৃন্দই প্রকৃত ঘটনার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিতে পারবেন। অধ্যাপক হকের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, তার প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ধারণামাত্র।
তার কাছে যদি তথ্য থেকেও থাকে তবে তা বড়জোর আংশিক কারণ তিনি গাড়ির জীবিত কোনো যাত্রীর সাথে কথা বলেননি। মামলা চলাকালীন আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার কথাও ভাবেননি আর মামলার বিবাদী পক্ষও তাকে সাক্ষী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেনি। অন্যদিকে জীবিত সাক্ষীরা আদালতে জবানবন্দিতে আমরা যা দেখেছি, তা-ই বলেছি, মাইক্রোবাস বাম লেনেই ছিল। ওই ভয়ানক মুহূর্তটি আমরা কখনও ভুলব না।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা অধ্যাপক শামসুল হকের মতবাদ প্রত্যাখ্যান করছি কারণ এটি একজন মানুষের চিন্তাপ্রসূত। পুলিশের প্রতিবেদন, আমরাসহ অন্যান্য সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মহামান্য আদালতের রায়ে বিষয়টি মীমাংসিত। সেই দুর্ঘটনায় স্বজনহারানোর বেদনা এক দশকে যেটুকু সহনীয় হয়েছে, সেই ক্ষত অধ্যাপক শামসুল হক আবার রক্তাক্ত করে তুলছেন কেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়। আমাদের আশঙ্কা বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের স্বার্থ রক্ষার্থে এই অপপ্রচার করা হচ্ছে।
আমরা আহ্বান জানাব, এই ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সকলকে আর অপমান করা হবে না। এই সড়ক দুর্ঘটনার মীমাংসিত ও চলমান মামলাসমূহ বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক, তাকে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রী ও চালকদের পরিবার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর। এই দুই খ্যাতিমানসহ আরও তিনজন সেদিন মৃত্যুবরণ করেন। তারা হলেন চালক মুস্তাফিজ, তারেক মাসুদের প্রোডাকশন ম্যানেজার ওয়াসিম ও কর্মী জামাল। ওইদিন তারেক মাসুদের নতুন চলচ্চিত্র 'কাগজের ফুল'-এর শুটিংয়ের স্থান দেখতে তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর ও তাদের সহকর্মীরা মানিকগঞ্জ যান। ফেরার পথে তাদের মাইক্রোবাসের সঙ্গে একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান তারা।
২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ওই বাসচালক জামির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। রায়ের পর তাকে প্রথমে মানিকগঞ্জ জেলা কারাগার ও পরবর্তীতে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই বাসচালক জামির হোসেন (৬০) মারা গেছেন।