বাজেট ২০২৪-২৫
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৪ ১৮:০৫ পিএম
বাঁ থেকে নাসির উদ্দীন ইউসুফ, রামেন্দু মজুমদার ও গোলাম কুদ্দুছ। প্রবা কোলাজ
প্রতিবার অন্তত অর্ধশত কোটি থেকে প্রায় শতকোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ বেড়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। তবে মোট বাজেটের তুলনায় তা শূন্য থেকে এক শতাংশের ঘরে ছুঁতে পারছে না। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের কমতি নেই সংস্কৃতিজনদের
টানা চার অর্থবছরে বাড়ানো হয়েছে সংস্কৃতি খাতের বরাদ্দ। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু হয়ে প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কোনো বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ কমেনি। প্রতিবার অন্তত অর্ধশত কোটি থেকে প্রায় শতকোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ বেড়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। তবে মোট বাজেটের তুলনায় তা শূন্য থেকে এক শতাংশের ঘরে ছুঁতে পারছে না। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভের কমতি নেই সংস্কৃতিজনদের মধ্যে। প্রত্যেকবার বাজেট ঘোষণার আগে নানান দাবি তারা সামনে হাজির করেন। এবারের বরাদ্দ নিয়েও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তারা।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বাজেটে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সংস্কৃতি খাতের জন্য প্রস্তাবনায় আছে ৭৯৭ কোটি টাকা।
কীসে ব্যয় সংস্কৃতির বরাদ্দ
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়- দেশজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সমকালীন শিল্প-সাহিত্য সংরক্ষণ, মুক্তচিন্তার প্রসার ও গবেষণা-উন্নয়নের মাধ্যমে জাতির মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের অধীন ২১টি দপ্তর-সংস্থা রয়েছে। দুটি খাতের ভিত্তিতে বাজেটে বরাদ্দের টাকা ব্যয় করে মন্ত্রণালয়। এগুলো হলো অর্থ পরিচালন ও উন্নয়ন। পরিচালন খাতের মধ্যে আছে নগদ মজুর ও বেতন, অনুষ্ঠান-উৎসব, বিশেষ অনুদান, কল্যাণ অনুদান, গবেষণা, বইপুস্তক বাবদ মঞ্জুরি, সাংস্কৃতিক মঞ্জুরি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয় সাংস্কৃতিক মঞ্জুরিতে। উন্নয়ন খাতের অর্থ ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণ, সম্প্রসারণ, সংস্কারসহ বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম পরিচালনায়।
চার মেয়াদে বরাদ্দ যত বেড়েছে
২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫৮৭ কোটি টাকা, যা সংশোধিত হয়ে দাঁড়ায় ৫৭৯ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ৬৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়; যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৫৮ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মন্ত্রণালয়টির জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৬৯৯ কোটি টাকা। সংস্কৃতি খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৭৯৭ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে তা শূন্য দশমিক ১০। বিদায়ি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ৭৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। শতাংশের হিসাবে তা মোট বাজেটের দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
সংস্কৃতিজনদের হতাশা
বরাদ্দ বাড়লেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী রামেন্দু মজুমদার। এক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিদের ইচ্ছার ঘাটতি রয়েছেও বলেও মনে করেন তিনি। রামেন্দু মজুমদার বলেন, ডিসেম্বর থেকে বাজেট তৈরি শুরু হয়। তখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিদের উচিত কোন কোন ক্ষেত্রে কী কী কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে জানানো। তাহলে একটি ফলপ্রসূ বাজেট হতে পারে। কিন্তু আমরা সেটি করি না। প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নের আগে বলতে থাকি- মোট বাজেটের এক শতাংশ চাই, কিন্তু আদতে তা হয় না।
সংস্কৃতি খাত আজীবন অবহেলিত বলে মনে করেন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঢাকা থিয়েটার ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তিনি বলেন, এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। বর্তমান সময়টা সারা বিশ্বের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে অস্থির। এমন পরিস্থিতিতে আগের চেয়ে বড় বাজেট করাটাই অনেক কঠিন। তবে আমি বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে ভাবছি না। এর পেছনে নতুন কোনো স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে কি না, সেটা দেখা জরুরি। অতীতে দেখেছি পরিকল্পনার অভাবে অল্প বরাদ্দের টাকাও সরকারের কাছে ফেরত পর্যন্ত গেছে। এর মানে টাকাগুলো কোন ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে কোনো পরিকল্পনা নেই। এজন্য কত টাকা এই খাতে বাজেট দিল, এখন আর তা নিয়ে ভাবি না।
প্রতিবার যে পরিমাণ বরাদ্দ বাড়ছে, তাতে আমূল কোনো পরিবর্তন দেখছেন না সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তিনি বলেন, একটা মন্ত্রণালয়ে যখন বাজেট পরিকল্পনা করা হয়, তখন অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়। কিন্তু সংস্কৃতিতে যুক্ত কারও সঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাজেট প্রণয়নের আগে কোনোদিন এ ধরনের আলাপ-আলোচনা করেনি। আমরা দেখি, টাকার অভাবে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যাচ্ছে না, অথচ মন্ত্রণালয় থেকে টাকা ফেরত যায়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে যারা এটির দায়িত্বে রয়েছেন তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
গোলাম কুদ্দুছ আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক একজন মানুষ। তিনি বারবার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গুরুত্বের কথা বলেও এসেছেন। তারপরও কী কারণে সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে না, সেই একই জায়গায় থেকে যাচ্ছে, আমরা তা জানি না। এবারের বাজেটে আমরা খুবই আশাহত, হতাশ। আমরা দীর্ঘদিন বলে আসছি, সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তুলতে হলে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ও নীতি-আদর্শবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরি করতে হবে। তা তৈরি হতে পারে একমাত্র শিক্ষা ও সংস্কৃতির জাগরণের মধ্য দিয়ে।
মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনা বিভাগ বলছে, বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা সম্মিলিতভাবেই করা হয়। সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে বাজেটের অর্থ ফেরত যাওয়ার অভিযোগটি ঠিক নয়। মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকে। বাজেটের অর্থ ফেরত যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তার পরিমাণ খুবই সামান্য। ৯০ শতাংশের বেশি অর্থই খরচ হয়।
এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আসাদুজ্জামান নূর গণমাধ্যমকে বলেন, সঠিক সময়ে কাজগুলো শেষ না হলে বরাদ্দ টাকার একটি অংশ ফেরত যায়। মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ সম্পর্কে স্পষ্টীকরণ থাকা দরকার। যাদের গবেষণার কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা, তারা গবেষণায় গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে টাকা খরচ করছে। সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে হলে সৃজনশীল চিন্তা করা শিখতে হবে।