× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বুয়েট নিয়ে নানা অভিমত

অপরাজনীতি বন্ধে গুরুত্ব দিতে হবে

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪ ১২:৪৬ পিএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান শিক্ষার্থীদের বড় অংশের আপত্তির মুখে আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ফিরছে ছাত্ররাজনীতি। এ নিয়ে নানা মত দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমান ও সাবেক ছাত্রনেতাসহ শিক্ষাবিদরাও। তাদের অনেকে বলছেন, শিক্ষার্থীদের আপত্তির মুখে জোর করে ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

আবার অনেকে বলছেন, রাজনীতির নামে অপরাজনীতির কারণেই শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিমুখ। তবে ‘মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা’ কোনো সমাধান নয়। ছাত্ররাজনীতি ফিরলে অপরাজনীতি বন্ধ নিশ্চিতের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সব দলের সহাবস্থান ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সুস্থ ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে পারলেই ছাত্ররা আর রাজনীতিকে ভয় পাবে না। 

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেন বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। ওই ঘটনায় করা মামলার রায় হয় ২০২১ সালে। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত।

বুয়েট কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ২৬ ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়। ওই বিক্ষোভের মুখে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি করতে কোনো বাধা নেইÑ হাইকোর্টের এই আদেশের পর গতকাল প্রশাসনিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে হাইকোর্টে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিজ্ঞপ্তি স্থগিতের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমরা বুয়েট প্রশাসনের কাছে দাবি রাখব যে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত যথাযথভাবে বিচার বিভাগের কাছে তুলে ধরা হোক।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি না থাকার দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং অটল। যে ছাত্ররাজনীতি র‌্যাগিং কালচারকে প্রশ্রয় দেয়, ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেয়, যার বলি হতে হয় নিরীহ ছাত্রদের। তা কখনোই আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি, আর ভালো কিছু বয়ে আনবেও না।

যা বলছেন বুয়েটের সাবেক ছাত্রনেতারা

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বুয়েট শাখার সাবেক সভাপতি ও সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের বর্তমান সভাপতি প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, সন্ত্রাস আর ছাত্ররাজনীতি এক হতে পারে না। ছাত্ররাজনীতিকে কেন ‘না’ বলব। ছাত্ররাজনীতি তো দেশে নেতৃত্ব তৈরি করে। ছাত্ররাজনীতি দেশকে নিয়ে ছাত্রসমাজে ভাবনা, দেশপ্রেম অধিকারবোধ তৈরি করে। ছাত্ররাজনীতিকে নয়, সন্ত্রাসকে ‘না’ বলা উচিত। 

বুয়েটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক মো. আবদুস সবুর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রগতির চাকাকে উল্টে দিয়ে বুয়েটে বারবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্যাম্পাসে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী উগ্রমৌলবাদের মাধ্যমে এই ক্যাম্পাসে ধীরে ধীরে মৌলবাদীদের আস্তানায় পরিণত করার চক্রান্তে লিপ্ত।

তারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গত ২৮ মার্চ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অধিকারকে ভুলণ্ঠিত করে একটি চক্র ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে ব্যস্ত হয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীদের নেতৃত্ব দানকারী বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সরাসরি অভিযুক্ত করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়। আমরা বুয়েট ছাত্রলীগের প্রাক্তন নেতাকর্মীরা, বুয়েটের এই অসহনীয় দমবন্ধ অবস্থার উত্তরণ চাই।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বুয়েট ছাত্র সংসদের প্রথম জিএস মুহম্মদ হিলাল উদ্দীন বলেন, আবরার হত্যা হয়েছে, এটা খুবই দুঃখজনক। বুয়েটের ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, তার সঙ্গে আমি পরিপূর্ণ একমত। ছাত্র সংগঠনগুলো কারোই কখনও ক্ষমতার বলে এরকম হওয়া উচিত নয়। শুধু আবরার নয়, সনি নামের যে মেয়েটি খুন হয়েছিল, তারও বিচার হয়নি। খুনের সঙ্গে জড়িতদের পার হয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে। সেটা নিয়েও বুয়েটের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তবে আবরারের ঘটনার পর  মাথাব্যথার জন্য যেভাবে মাথা কেটে নেওয়া হয়েছে, সেটা বেশিদিন চালানো যায় না। 

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমানে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়। এই দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা ছিল। তবে ছাত্ররা এখন অপরাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তাই অপরাজনীতি দূর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। 

বর্তমান ছাত্রনেতারা যা বলছেন

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাফিকুজ্জামান ফরিদ বলেন, সন্ত্রাস, দখলদারত্বের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে। সন্ত্রাস-দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মনোভাবের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা বলতে চাই, ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা বিঘ্নিত হলে অগণতান্ত্রিক-ফ্যাসিস্ট শক্তি জেঁকে বসে। দখলদারত্ব, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি তারই ফল।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি দীপক শীল বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থীরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি করছে যা পুরোপুরি যৌক্তিক। তাদের এই দাবির সাথে আমরা পুরোপুরি একমত। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার যে আলাপ তৈরি করা হয়েছে, বুয়েটজুড়ে তা অনভিপ্রেত। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ভার ক্রিয়াশীল সকল ছাত্র সংগঠনের ওপর বর্তায় না। 

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে ছাত্রলীগ পুরো ছাত্ররাজনীতিকে কলঙ্কিত করেছে। শুধু বুয়েট নয়, আবরারের হত্যা পুরো ছাত্রসমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বুয়েট থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য শিক্ষার্থীরা যেভাবে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করছে, সেসবের পুরো দায়ভার ছাত্রলীগকে নিতে হবে। এখানে অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর কোনো দায় নেই।

১৫ বছর ধরে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ছাত্রলীগ একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। আবাসিক হলগুলো দখল করে রেখেছে। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সক্ষম হলে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদল সুস্থ ধারার রাজনীতি উপহার দেবে। তখন ক্যাম্পাসে রাজনীতিবিমুখতার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হবে না। ক্যাম্পাসের মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনীতিতে অংশ নেবেন।

সাবেক ছাত্রনেতারা যা বলছেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন বলেন, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে সবার সম্মতিক্রমেই। বুয়েটে যে সমস্যার কারণে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছে, সেই সমস্যার তো সমাধান হয়নি। তবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হয়। কিন্তু বুয়েটের সাধারণ ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকে সঠিক মনে করছে। কাজেই তাদের মতামতকে আমাদের সম্মান দেওয়া উচিত। জোর করে কিছু করতে গেলে সেটার অবস্থা হিতে বিপরীতই হবে।

 শিক্ষাবিদরা যা বললেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আবরারের হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই পজিটিভ নয়, এটা অপরাজনীতি। আর বুয়েটের ছাত্ররা আসলে সেই অপরাজনীতির বিরুদ্ধেই আন্দোলন করছে। এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে রাজনীতি মানুষের মৌলিক অধিকার। 

‘নীতিহীন রাজনীতি দেশের কোনো কল্যাণে আসে না’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই উক্তিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, আমরা নীতিহীন রাজনীতি করতে চাই না। নৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে সুস্থ রাজনীতি করতে চাই। সেই রাজনীতি ছাত্র-ছাত্রীদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তৈরি করবে। সেই ধরনের রাজনীতি যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে সেটা সাধারণ মানুষ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা