প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:৩৮ এএম
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার গণিত শিক্ষক মুরাদ হোসেন। প্রবা ফটো
ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার শিক্ষক মোহাম্মদ মুরাদ হোসেন সরকারকে রিমান্ডে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তার কাছ থেকে ছাত্রী নিপীড়নসংক্রান্ত কিছু তথ্য পাওয়া গেছে এবং অন্যান্য সূত্র থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। সেগুলো যাচাইবাছাই করছে পুলিশ।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা লালবাগ থানার ওসি খন্দকার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা তাকে নানাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন কৌশলে জেরা করা হয়েছে।’ তিনি (মুরাদ হোসেন) অভিযোগ স্বীকার করেছেন কি না, জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘আমারা তদন্তে নেমে শিক্ষার্থী নিপীড়নসংক্রান্ত কিছু কিছু প্রমাণ পেয়েছি। সেগুলো যাছাইবাছাই করা হচ্ছে।’
পুলিশের লালবাগ বিভাগের অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলার বাদী, ভিকটিম ও স্কুলের বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান ছাত্রীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তাদের বক্তব্য ও বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু প্রমাণ মিলেছে। সেগুলো যাছাইবাছাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া মুরাদ হোসেনের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে। সেগুলোও ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে কোনো অডিও বা ভিডিও ডিলিট করা হয়েছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর শাখার গণিতের শিক্ষক মুরাদ হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে গত সোমবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন এক ছাত্রীর মা। রাতেই কলাবাগানের বাসা থেকে মুরাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাইলে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন, গত বছর তার মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় গণিতের শিক্ষক মুরাদ হোসেনের ব্যক্তিগত কোচিং সেন্টারে প্রাইভেট পড়ত। তখন মুরাদ ওই ছাত্রী ও তার সহপাঠীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেন। গত বছরের ১০ মার্চ কোচিং শেষে অন্য সহপাঠীদের ছুটি দিয়ে কৌশলে বাদীর মেয়েকে আটকে রাখা হয়। পরে তার সঙ্গে ‘খারাপ’ আচরণ করেন মুরাদ। এ ছাড়া প্রায়ই তার শরীরে তিনি হাত দিতেন। পরে বাদী জানতে পারেন, শিক্ষক মুরাদ আরও অন্তত দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই আচরণ করেছেন। অনেক ছাত্রী এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ থানার এসআই ফাইয়াজ হোসেন বলেন, ‘রিমান্ডে মুরাদ হোসেনকে অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হবে। ভুক্তভোগীরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অভিভাবকের উপস্থিতিতে তাদের বক্তব্যও শোনা হবে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা হবে।’ তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, শিক্ষক মুরাদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। আজ বৃহস্পতিবার তার রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হবে। প্রয়োজন হলে তার পুনরায় রিমান্ড চাওয়া হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তিনি কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার কি না, তা-ও খতিয়ে দেখবে পুলিশ। যে ফেসবুক গ্রুপ থেকে অভিযোগটি ছড়ানো হয়, সেটি কারা পরিচালনা করেন, তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সে বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
এদিকে ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক ‘আপাতত’ কোচিং করাতে পারবেন না বলে নির্দেশ দেন। বিষয়টি সব শিক্ষককে জানানো হয়েছে। কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি তাকে বরখাস্তের সুপারিশ না করে বদলির সুপারিশ করে। পরে শনিবার মুরাদকে প্রত্যাহার করে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এতে সন্তুষ্ট না হয়ে রবিবার মুরাদের শাস্তির দাবিতে ছাত্রীরা আজিমপুর ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে। পরে বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। সোমবার রাতে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভায় মুরাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটিতে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের একজন প্রতিনিধি, ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) ও মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশির) ঢাকা অঞ্চলের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। তবে ভিকারুননিসার কোনো প্রতিনিধি কমিটিতে না রাখতে স্কুল কর্তৃপক্ষ সুপারিশ করেছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসেনি।