সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৮:৩৫ এএম
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১১:৪৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পরিবেশে পাঠদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, নতুন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতা, সৃজনশীলতা, জ্ঞান ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আগ্রহী হবে। এ উদ্দেশ্যে চিরাচরিত পাঠ্যসূচি এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিও পাল্টে ফেলা হয়েছে। তুলে দেওয়া হয়েছে দশম শ্রেণির আগে সব পাবলিক পরীক্ষা। থাকছে না জিপিএ পদ্ধতিও। নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজনও রাখা হয়নি। শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো বিভাগে পড়ার সুযোগ পাবেন একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে। এক কথায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে চলেছে শিক্ষাব্যবস্থায়।
তবে এ শিক্ষা পাঠ্যক্রম নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনাও। যদিও শিক্ষাবিদদের অনেকেই বলছেন, ‘নতুন পাঠ্যক্রম ভালো। এই পাঠ্যক্রম শিক্ষার্থীকে দক্ষ, যোগ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক।’ তবে তারা এ-ও বলছেন, ‘পাঠ্যক্রম শুরুর জন্য আরও প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল।’ এদিকে জাতীয় কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বলছে, ‘পাঠ্যক্রমকে বিতর্কিত করার পেছনে রয়েছে কোচিং সেন্টার ও নোট-গাইড ব্যবসায়ীরা। কারণ এই পাঠ্যক্রমে কোচিং ও নোট-গাইডের কোনো প্রয়োজন নেই।’
২০১৭ সালে নতুন শিক্ষাক্রমের চাহিদা নিরূপণ ও বিশ্লেষণের কাজ শুরু করে এনসিটিবি। এরপর একাধিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে ২০২১ সালে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা-২০২১’ প্রণয়ন করা হয়। চলতি বছর প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণিতে শুরু হয় নতুন পাঠ্যক্রমের আদলে পাঠদান। কিন্তু নতুন পাঠ্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষকদের ঠিকমতো প্রশিক্ষণ না দেওয়ায় এক বছরের মাথায় এসেও অনেক শিক্ষকেরই নেই পাঠ্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মাঠ পর্যায়ে। আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হবে কি নাÑ তা নিয়ে শঙ্কিত অনেকেই। কারণ নানা কারণ দেখিয়ে ইতোমধ্যেই মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণ দুইবার পিছিয়েছে। বই পাওয়ার পর এই প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে নতুন পাঠ্যক্রমের ফল নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, ‘নতুন পাঠ্যক্রমের জন্য শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নামমাত্র প্রশিক্ষণে ভালো কোনো ফল আসবে না।’
চলতি বছরের ধারাবাহিকতায় আসছে শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে। এরপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে ধাপে ধাপে নতুন পাঠ্যক্রম চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
কেন এত বিতর্ক
একাধিক অভিভাবক দাবি করছেন, নতুন পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীদের বই পড়ার আগ্রহ কমেছে। পড়ালেখায় তাত্ত্বিক বিষয় শেখার বিপরীতে বেড়েছে কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিস। ডিভাইস ব্যবহারের পরিধি বাড়ার সুযোগে বেড়েছে ডিভাইসের প্রতি আসক্তি। স্কুলব্যাগে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে বেশি থাকছে শিক্ষা উপকরণ। অভিভাবকরা মনে করছেন, নতুন পাঠ্যক্রমে শ্রেণিকক্ষের বাইরে হাতে-কলমে শিক্ষার ক্ষেত্রে আর বছর শেষে সামষ্টিক মূল্যায়নেও পাঠ্যবইয়ের তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
নবম শ্রেণিতে বিভাগ নির্বাচনের সুযোগ থাকবে না শিক্ষার্থীদের। একই সঙ্গে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই যুগ ধরে প্রচলিত জিপিএ পদ্ধতিও। এর ফলে সমাপ্তি ঘটতে চলেছে জিপিএ-৫ কিংবা গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতার। শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে পারফরম্যান্স ‘ইনডিকেটর’, অর্থাৎ বিশেষ পারদর্শিতার ‘চিহ্ন’। এগুলো হলোÑ ত্রিভুজ, বৃত্ত, চতুর্ভুজ।
চলতি বছরে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ পারদর্শিতা বোঝাতে ব্যবহার করা হবে ‘ত্রিভুজ’। পারদর্শিতার সর্বনিম্ন সূচক ‘চতুর্ভুজ’। আর মধ্যম হলো ‘বৃত্ত’। কোনো শিক্ষার্থী তিনটি বিষয়ে চতুর্ভুজ পেলে পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ার জন্য বিবেচিত হবে না। অভিভাবকদের অনেকেই ৯ম শ্রেণিতে আগের মতো শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভাগ নির্বাচনের এবং মূল্যায়নে ত্রিভুজ, বৃত্ত, চতুর্ভুজ ইত্যাদি নির্দেশক বা ইন্ডিকেটর বাতিল করার দাবি জানাচ্ছেন।
অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের দলগত শিখন পদ্ধতি এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক ক্লাসে নানা সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ছে। এতে হঠাৎ করে বেড়েছে শিক্ষা ব্যয়ও। যা কেনা সব অভিভাবকের পক্ষে সম্ভবও হচ্ছে না। তাই নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষকদের সংখ্যা কম। গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধায়ও রয়েছে নানা পার্থক্য।
এ প্রসঙ্গে পাঠ্যক্রম উন্নয়ন ও পুনর্বিবেচনা বিষয়ক কোর কমিটির সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আহসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নতুন পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন শুধু পাঠ্যপুস্তক কিংবা পাঠ্যক্রমের নয়Ñ এটা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার রূপান্তর ঘটাচ্ছে। এই রূপান্তর যখন ঘটে, তখন মানুষের প্রতিদিনের চর্চা এবং বিশ্বাসও ভাঙতে থাকে। গত ছয় জেনারেশন ধরে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে যা ছিল, এখন তা নেই। ফলে অভিভাবকরা সংশয়ে পড়েছেন এবং প্রশ্ন উঠছে, আমাদের সন্তানরা কিছু শিখছে কি না। মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগায় তারা উদ্বিগ্ন।’
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবীর বলেছেন, ‘উন্নত বিশ্বের মতো শিক্ষার হার, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতনতা তো আমাদের দেশে নেই। পরিবর্তন সমাজে এমনভাবে হতে হয়, যাতে সমাজ সেটি গ্রহণ করতে পারে। হঠাৎ করে চাইলেই তো সমাজ পরিবর্তন হবে না। আমাদের পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের অবস্থা হয়েছে এমনই।’
যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাব
অভিযোগ রয়েছে, নতুন পাঠ্যক্রমে মাধ্যমিকে ৬২টি বিদ্যালয়ের নামমাত্র পাইলটিং হয়েছে। ঠিকমতো প্রশিক্ষণ না দেওয়া অনেক শিক্ষকেরই পাঠ্যক্রম সম্পর্কে নেই সুস্পষ্ট ধারণা। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে আরও ৪টি শ্রেণিতে নতুন পাঠ্যক্রমে পাঠদান শুরুর কথা। তবে সেখানেও যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, গত বছর নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিলেও আগামী বছরের জন্য এখনও শুরু হয়নি শিক্ষক প্রশিক্ষণ। এর মধ্যে দুইবার তারিখ ঘোষণা দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করতে পারেনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশি বলছে, চলতি মাসের শেষদিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একটি সূত্র জানাচ্ছে, অর্থছাড় না হওয়ায় ট্রেনিং পেছানো হয়েছে। জানুয়ারি মাসে বই পাওয়ার পরই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ হবে বলে জানিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এদিকে নির্বাচনের এই অস্থির ডামাডোলের মধ্যে মাউশির প্রশিক্ষণ কতটা মানসম্মত হবে তা নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানান, নতুন পাঠ্যক্রমের জন্য পাঁচ দিনের যে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে, তা খুব একটা ভালো ছিল না। প্রশিক্ষণের নেতিবাচক প্রভাবও সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। আবারও এ রকম নামমাত্র ট্রেনিং দেওয়া হলে এর ফল ভালো হবে না।
শিক্ষকরা আরও জানান, কোনো ব্যবহারিক বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত হওয়া উচিত সর্বোচ্চ ৩০:১। না হলে একজন শিক্ষকের পক্ষে তদারক করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে এমন অনেক শ্রেণিকক্ষ আছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮০ থেকে ১০০ জন। সেখানে এই পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়াও অ্যাসাইনমেন্টের সরঞ্জামের জন্য সরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা না পাওয়ায় সব শিক্ষার্থী সরঞ্জাম কিনতে পারছে না। গ্রুপভিত্তিক পাঠদানের জন্য যোগাযোগ করতে সবার মোবাইল কিংবা ডিভাইস নেই। যার প্রভাব পড়ছে বিশেষত নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের ওপর।
এ বিষয়ে মাউশির সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসইডিপি) ডেসিমিনেশন অব নিউ কারিকুলাম স্কিমের পরিচালক সৈয়দ মাহফুজ আলী বলেন, ‘আমরা এমপিও এবং নন-এমপিও সব ধরনের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ৪ লাখ ২৫ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠ পর্যায় থেকে ৫ লাখেরও বেশি নাম এসেছে। তাই মাঠ পর্যায় থেকে আবারও তালিকা যাচাই-বাছাই করে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হলে শিগগির ট্রেনিং শুরু হবে।’
যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা হয়েছে বলে মনে করছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ও। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে নেটওয়ার্ক জানায়, ‘অ্যাকটিভিটি-নির্ভর পাঠদানের নতুন এই ধরন প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান ও গণিতের বিশদ ভিত্তি। নতুন পাঠ্যক্রমে উচ্চবিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞান ও গণিতকে সীমিত করাটা আত্মঘাতী। বিজ্ঞান ও গণিতের এ সীমিত জ্ঞান দিয়ে উন্নত মেধাসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলা অসম্ভব।’
নতুন পাঠ্যক্রমে যা আছে
নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তর, অর্থাৎ নার্সারি ও প্লে-তে শিশুদের জন্য এখন আর কোনো বই থাকবে না। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকরাই তাদের সরাসরি শেখাবেন। এরপর প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের তিনটি বই পড়ানো হবে। তবে কোনো পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে বছরব্যাপী চলা বিভিন্ন শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তী শ্রেণিগুলোর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে অবশ্য পরীক্ষা ও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রমÑ দুটোই থাকছে। এক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে ত্রিশ থেকে ষাট ভাগ পর্যন্ত মূল্যায়ন করা হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিখনকালে। বাকি ৪০ ভাগ মূল্যায়ন হবে আগের মতোই পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে।
নতুন পাঠ্যক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে কেবল দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচি অনুসারে অভিন্ন দশটি বিষয়ের ওপর এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে। একইভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ধরনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার পরিবর্তে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি আলাদা পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
এ প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষা কোনো হালকা জিনিস হয়। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখে আসছি, ইংলিশ মিডিয়াম ও মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমের কোনো পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন হয় শুধু মূল ধারার পাঠ্যক্রমে। এতে শিক্ষার প্রবহমানতা নষ্ট হয়। যেমনÑ সৃজনশীল ধারা চালু করা হয়েছিলÑ এতে কী লাভ হলো? উল্টো ক্ষতি হয়েছে। এই নতুন পাঠ্যক্রম নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বলা হচ্ছে, জ্ঞানের থেকে দক্ষতা বৃদ্ধি করবে এই পাঠ্যক্রম। কিন্তু এগুলো কোনো কাজের কথা নয়। কারণ জ্ঞানই হচ্ছে শিক্ষার মূল কথা। দক্ষতা কোনো শিক্ষা নয়।’
এদিকে যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছেÑ এ কথা মানতে নারাজ অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আহসান। তিনি বলেন, ‘আগেও যখন পাঠ্যক্রম শুরু হয়েছে, তখনও কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে শুরু হয়নি। পাইলটিং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কিংবা শিক্ষক সহায়িকা গাইড তৈরি করার আগেই পাঠদান শুরু হয়েছিল। এবারই প্রথম পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক সহায়িকা গাইড ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু হচ্ছে।’
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যক্রম) অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, ‘পাঠ্যক্রম পরিবর্তন সব সময় হতে পারে। পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সংকীর্ণতা নেই। কল্যাণকর কিছু গ্রহণ করতে আমাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। কেউ যদি কোনো ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়, তাহলে আমরা তা সংশোধন করব। কিন্তু যারা ভাবছেন যে, পাঠ্যক্রম বাতিল হয়ে যাবে বা স্থগিত হয়ে যাবে, তারা ভুল ভাবছেন। নতুন পাঠ্যক্রম জাতির প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট।’
পাঠ্যক্রমে কেন এত পরিবর্তন?Ñ এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মশিউজ্জামান বলেন, ‘মুখস্থ ও পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা থেকে বের হতে দীর্ঘদিন ধরে নানা উপায় খোঁজা হচ্ছিল। বিশেষজ্ঞদের গবেষণার ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে রিভিশন হওয়া পাঠ্যক্রম ‘এমসিকিউ’ এবং ২০০৮ সালের রিভিশনে ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি আনা হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই দুই পদ্ধতিতেও মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষা পদ্ধতি রয়ে গেছে। এতে শিখন ফল অর্জিত হচ্ছে না। তাই আমরা পুরোপুরি পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, ‘পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়ে আসলে কোনো কিছু শুরু করা যায় না। এর আগেও যতবার পাঠ্যক্রম রিভিউ হয়েছে ততবারই প্রশ্ন উঠেছে, আমরা প্রস্তুত কি না। এখনও সেই প্রশ্ন উঠছে। তবে পাঠ্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া।’