সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৩ ০০:৪২ এএম
আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩ ১১:৪০ এএম
শনিবার ঢাকায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। প্রবা ফটো
মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১টা। বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলের তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির প্রথম দিন রাজধানীর মিরপুরে নূর-এ-মক্কা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ সময় হুড়োহুড়ি করে বাস থেকে নামা যাত্রীদের মধ্যে ৭-৮ জন ছিল স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছাত্রী। ভয়ে-আতঙ্কে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাদের নাম এবং তারা কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী- তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
শুধু মিরপুর নয়, সকালে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী পরিবহনকারী স্বপ্নচূড়া বাসে হামলা চালিয়েছে অবরোধকারীরা। নারায়ণগঞ্জ থেকে শিক্ষার্থী নিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে সকাল ৮টায় গেন্ডারিয়ায় বাসটি পৌঁছলে অবরোধকারীরা অতর্কিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে কোনো শিক্ষার্থী আহত না হলেও তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত রবিবার হরতাল ও গতকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অবরোধে রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত পরিবহনে আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ বিরাজ করছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। কমেছে রাজধানীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও। এরই মধ্যে স্থগিত করা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা। এবার নভেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব ক্লাসের সমাপনী পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, রাজনৈতিক এই অস্থিরতায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমেছে উপস্থিতি
রাজধানীর মোহম্মদপুর ওয়াইডব্লিউসিএ স্কুলে পড়ালেখা করে ঢাকা উদ্যানের রুধবা ও রুধিরা। প্রতিদিন সকালে তাদের মা কনক খান তাদের নিয়ে আসেন স্কুলে। কিন্তু হরতাল ও অবরোধের দিন ভয়ে তাদের স্কুলে নিয়ে আসেননি তিনি। কনক খান বলেন, হরতালের প্রথম দিন মোহাম্মদপুরে দুটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পরিবহনে আগুন দেওয়া হচ্ছে। এতে ভয়ে তাদের স্কুলে নিয়ে যাইনি। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা থাকলে সমাপনী পরীক্ষা ও সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।
এভাবেই অবরোধের কারণে রাজধানীর প্রতিটি স্কুলেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে দেশের ইংরেজি মাধ্যমসহ অনেক বেসরকারি স্কুল-কলেজে সশরীরে ক্লাস বন্ধ রয়েছে। সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভার্চুয়ালি ক্লাস করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধের মধ্যেও ক্লাস-পরীক্ষা চলবে বলে জানানো হয়েছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু বলেন, এ ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যেমন ক্ষতি, তেমনি বাচ্চাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে স্কুল বন্ধ রাখা উচিত। নভেম্বর মাসে সব স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।
ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। রাস্তায় গাড়িতে জ্বালাও-পোড়াও, ককলেট নিক্ষেপ, মারামারির কারণে অভিভাবকরা ভয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, তারা যেন সহিংস রাজনীতি না করেন। শিক্ষার্থীদের যেন টার্গেট না করেন। শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে যেন তারা কর্মসূচি দেন।
লালবাগ সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মঈন উদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই স্থানীয়। তারপরও অবরোধের ভয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কমেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সব স্তরের ক্লাস ও পরীক্ষা চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তবে কোনো অভিভাবক যদি তার সন্তানকে স্কুলে না পাঠায় তবে তাকে অ্যাবসেন্স (অনুপস্থিত) দেওয়া যাবে না। এ সংখ্যা যদি বেশি হয়, তবে তাদের জন্য ভার্চুয়ালি ক্লাস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) প্রফেসর বেলাল হোসাইন বলেন, বছরের শেষপ্রান্তে বার্ষিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সময়ে এসে রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যায় না। তাই অবরোধের মধ্যেও ক্লাস চালিয়ে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তবে কোনো অভিভাবক যদি তার সন্তানকে না পাঠায়, তবে তাকে অনুপস্থিত দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, কোনো বেসরকারি স্কুল যদি চায় সশরীরে ক্লাস না নিয়ে ভার্চুয়ালি নেবে, সেটি তারা করতে পারবে।
নভেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা
গত রবিবার হরতালের কারণে স্থগিত করা হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা। তিন দিন অবরোধের কারণে মঙ্গল ও বুধবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ছাড়া অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়ন। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সামষ্টিক মূল্যায়নের সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে বলে গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।
এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের কারণে সব মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা ডিসেম্বর থেকে এক মাস এগিয়ে নভেম্বরে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। পরীক্ষা নেওয়ার পর নভেম্বরেই ফল প্রকাশ করে ডিসেম্বরের শুরুতেই ভর্তি কার্যক্রম শেষ করার কথা। সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু হঠাৎ করেই সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদল বিএনপি এবং সমমনা দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থাকার কারণে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমাঝোতায় না এলেই এই উত্তাপ আরও বাড়বে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে। ভয়ভীতির কারণে তাদের মধ্যে মানসিক চাপ বাড়ছে। এসব কর্মসূচি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে পরীক্ষায়ও প্রভাব পড়বে।
অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, নভেম্বরে পরীক্ষা নেওয়ার টার্গেট নিয়ে আমরা আগেভাগেই এবার সিলেবাস শেষ করেছি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মোটামুটি শেষ। এখন তারা রিভিশন দিচ্ছে। তবে এভাবে যদি রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই পরীক্ষায় প্রভাব পড়বে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বলেন, এভাবে সহিংসতামূলক কর্মসূচি থাকলে শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারবে না। ভয়ে মানসিক চাপ বাড়বে। এর প্রভাব পরীক্ষায় পড়বে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, ‘এ সময়ে ক্লাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা শিক্ষাবর্ষ শেষ হচ্ছে। আরেকটা শুরু হবে। করোনাভাইরাসের কারণে যে ঘাটতি হয়েছিল, সেটা পূরণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাকার্যক্রমকে কর্মসূচির আওতার বাইরে রাখা।’