রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
এম আর মাসফি
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:১৮ পিএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:৩০ পিএম
দায়সারাভাবে তৈরি প্রকল্পের মাশুল গুনছে সরকার। অনুমোদনের পর কোনো কাজ না করে এক বছরের মাথায় প্রকল্পের খরচ বাড়ছে ৪০৩ কোটি টাকা। সেই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২২ সালের জুনে অনুমোদন দেওয়া হয় রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পটি। পরের মাস জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কাজ শুরু করার কথা থাকলেও এখনও কোনো কাজই করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। তবে কাজ না করলেও এক বছরের মাথায় প্রকল্পের খরচ ৪০৩ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাব করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের প্রস্তাবিত আরএমইউ স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পটি ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য গত বছর একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জমিই অধিগ্রহণ হয়নি। এমনকি উল্লেখযোগ্য কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। কাজ ছাড়াই এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৫৮৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কিন্তু ভৌত অগ্রগতি শূন্য। খরচের বিষয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর আগের প্রাক্কলন অনুযায়ী জমির অধিগ্রহণ মূল্য হিসেবে এ পরিমাণ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
সংশোধনীর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনে নির্মাণ ও পূর্ত খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়াতে সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশোধনী প্রস্তাবে খরচ ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৭০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে ৪০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্পের নির্মাণ ও পূর্ত খাতে অনুমোদিত ৮৬৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার জায়গায় ১ হাজার ৯৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
এদিকে জমির পরিমাণ কমলেও অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পে ৬৭ দশমিক ৭৮২০ একর জমির জন্য খরচ ধরা হয়েছিল ৫৮৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে জমির পরিমাণ ১০ দশমিক ২৮ শতাংশ কমলেও খরচ ১৭২ কোটি ১৮ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭৫৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ছয়টি গাড়ি কেনা না হলেও পেট্রল, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট খাতে ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আলোচ্য প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাবে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন খাতের অত্যধিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও জমি অধিগ্রহণ করতে না পারায় দীর্ঘসূত্রতা হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যে দুইটি কারণে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছাড়া আর কিছুই নয়। রেট-শিডিউল পরিবর্তন হবে এটা স্বাভাবিক বিষয় সেভাবেই ব্যয় ধরা দরকার ছিল। আর এক বছরেই কীভাবে জমির দাম বাড়ে। জমির দর ডিসি অফিস থেকে নেওয়ার কথা। ধারণার ভিত্তিতে জমির দাম নির্ধারণ করেছে। যারা এই দায়সারা প্রকল্প নেওয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশোধনী প্রস্তাবের জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন খাতে অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্পের এক বছর পার হলেও কোনো বাস্তব অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করে এবং জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, জমির পরিমাণের তারতম্যের প্রভাব উল্লেখ করে সংশোধিত প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পাঠাতে বলা হয়েছে।
সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে পিইসি সভায় বিভিন্ন শর্ত দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ছয়টি গাড়ির পরিবর্তে চারটি গাড়ি রাখতে হবে। গাড়ি না কেনা পর্যন্ত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুটি গাড়ি ভাড়া নিতে হবে। সরকারি অর্থায়নে বিদেশ প্রশিক্ষণ বাবদ বরাদ্দ ১ কোটি টাকা প্রকল্প থেকে বাদ দিতে বলা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের আওতায় নির্ধারিত ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা এবং ভবিষ্যতে ভূমি অধিগ্রহণমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অধিকতর যত্নবান হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। বর্ণিত শর্তসমূহ প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আরডিপিপি পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়।
প্রকল্পের এক বছর যেতে না যেতেই সংশোধন প্রস্তাবের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও আরএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এজেডএম মোস্তাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করেই প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণই জেলা প্রশাসকের হাতে। তিনি প্রথমদিকে যে হিসাব দিয়েছিলেন সেভাবেই বরাদ্দ রাখা হয়। অথচ চূড়ান্ত হিসাবে ব্যয় বেড়ে গেছে। এ কারণেই ব্যয় ও মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।