চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপন
এম আর মাসফি
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:১৮ পিএম
আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:২০ পিএম
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপন প্রকল্পে বারবার দরপত্র দিয়েও মিলছে না ঠিকাদার। কথা ছিল, তিন বছরে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু তা গত সাড়ে ৭ বছরেও শেষ হয়নি। প্রকল্পটি যাতে শেষ করা যায় সেজন্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ আবারও এর মেয়াদ দেড় বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। খরচ হয়েছে ১৮১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় ১৩টি বিভিন্ন ধরনের ভবন, রিসার্চ ফার্ম শেড, পন্ড কমপ্লেক্স, রেসওয়ে, সীমানা প্রাচীর, আরসিসি সড়ক, জেনারেটর ভবন ইত্যাদির সব রকম নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে লিফট, এসি ও জেনারেটর ইন্সটলেশনের কাজ চলছে।
নতুন করে মেয়াদ ও ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব
প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের সংস্থানকৃত ৩০০০/৩১৫০ কেডিএ ড্রাই টাইপ সাবস্টেশন, ডেইরি প্ল্যান্ট ও ফিশারিজ অনুষদের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিসমূহের জন্যে কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু ডলার সংকট ও উচ্চমূল্যবৃদ্ধির কারণে কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। তাই একান্ত অপরিহার্য পূর্ত কাজ, যেমনÑ প্রবেশ গেট, গ্যারেজ, বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল, শহীদমিনার, ফিশ হ্যাচারি ইত্যাদি নির্মাণের লক্ষ্যে পিডব্লিউডি-২০২২ (সংশোধিত) রেট সিডিউল অনুসারে সংশোধন করে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ মেয়াদে ২৩০ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পের ২য় সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় ৬টি খাতের কাজ বাদে সব কাজই শতভাগ শেষ হয়েছে। সব কাজ শেষ না হওয়া খাতগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও অন্য সরঞ্জামাদি খাতে ৮২ শতাংশ, অফিস সরঞ্জামাদি খাতে ৮১ শতাংশ, আসবাবপত্র খাতে ৯২ শতাংশ, পোস্ট গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হল (ছাত্রী) নির্মাণে ৯০ শতাংশ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা খাতে ৬৫ শতাংশ এবং বিধি গবেষণা ফার্ম/শেড নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
বারবার দরপত্র দিয়েও ঠিকাদার না পাওয়ার বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ রকম ঘটছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও ৩০০০/৩১৫০ কেভিএ ড্রাই
টাইপ বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খোলা সম্ভব হয়নি। তাই প্রকল্পের সংস্থানকৃত ডেইরি প্ল্যান্ট ইকুইপমেন্ট ও ফিশারিজ অনুষদের ইকুইপমেন্ট কিনতে কয়েক দফায় ইজিপিতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেও তা সংগ্রহ করা যায়নি।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, মূলত এসব মালামাল জার্মানি/ ইতালি/ ইউকে/ ইউএসএ/ ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ থেকে আমদানি করা হবে। তা ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে নির্মিত বিভিন্ন গবেষণা ফার্স/শেড, ফুড পাইলট প্ল্যান্ট ও ল্যাবে অনুমোদিত যন্ত্রপাতি স্থাপন করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত করতে ৩০০০/৩১৫০ কেভিএ ড্রাই টাইপ বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন স্থাপন করা দরকার। তাই বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার দর ও ডলারের মূল্যস্ফীতি যোগ করে অনুমোদিত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্য সরঞ্জামাদি খাতে ৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ও সাব-স্টেশন স্থাপনে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি খাতে ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
যে কারণে এ প্রকল্প
প্রকল্পের বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়, ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। যা ভেটেরিনারি মেডিসিন, মাৎস্যবিজ্ঞান এবং খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। এর মূল ক্যাম্পাস চট্টগ্রামের মূল শহরে মাত্র ৭ একর জায়গার ওপর স্থাপিত। এ কারণে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় সর্বমোট ২০ একর জমিতে এর দ্বিতীয় ক্যাম্পাস স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। যাতে একাডেমিক ভবন, ক্লাসরুম ও ল্যাবরেটরির সংখ্যা, প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক সুবিধাদিসহ গবেষণার সুযোগ বাড়ানো যায়। গবেষণার সুবিধার্থে রিসার্চ ফার্ম/শেড ও হ্যাচারি নির্মাণ করা যায়। ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় ক্যাম্পাস স্থাপন’ শীর্ষক এ সংক্রান্ত প্রকল্পটি ফেব্রুয়ারি ২০১৬ থেকে জুন ২০১৯ মেয়াদে মোট ১৭৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালের মার্চে একনেকে অনুমোদিত হয়।
তবে প্রকল্প এলাকা সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ অবস্থিত হওয়ায় এবং তাদের নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধ থাকায় প্রকল্পে সংস্থানকৃত কয়েকটি স্থাপনার স্থান পরে পরিবর্তন করা হয়। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অ্যানিমেল ফার্ম, ফুড পাইলট প্ল্যান্ট, ফিশ হ্যাচারি, বিবিধ রিসার্চ শেড, ফিল্ড ভেটেরিনারি হাসপাতাল ইত্যাদি। সিদ্ধান্ত হয় এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পূর্বদিকের ১০ একর নিরাপদ জমিতে নতুনভাবে নির্মাণ করা হবে। এই প্রস্তাবসহ পিডব্লিউডি-২০১৮ রেট সিডিউল অনুসারে ব্যয় প্রাক্কলন সংশোধন করে প্রকল্পের ১ম সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনামন্ত্রী ২০২১ সালের এপ্রিলে অনুমোদন দেন। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো ছাড়াই এর মেয়াদ ৩ দফায় জুন ২০২৩ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে প্রস্তাবনায় বলা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা ও ফার্মভিত্তিক অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ছাত্রছাত্রীদের ও শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসিক ব্যবস্থা হবে। আধুনিক সুবিধাযুক্ত ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ও ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম স্থাপন করা হবে। বিদ্যমান ২৩টি গবেষণাগার আধুনিকায়ন এবং ভেটেরিনারি হাসপাতালের সুবিধা বাড়ানো যাবে। খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের জন্য পাইলট প্ল্যান্ট তৈরি হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ক্লাসরুম সুবিধাদির সৃষ্টি হবে।
প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা বলছেন যে টেন্ডার দিয়েও তারা ঠিকাদার পাচ্ছেন না। সেটা পিইসি সভায় বোঝা যাবে। তবে প্রকল্পের ৮৫ শতাংশ কাজই শেষ হয়ে গেছে। যদিও তারা প্রকল্পে অনেক সময় ব্যয় করে ফেলেছে। সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও পিইসি সভাতেই চূড়ান্ত হবে।