রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:১৩ পিএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২২:১৩ পিএম
শিশু শিক্ষার্থী। ছবি : সংগৃহীত
গাজীপুরে কোনো ধরনের নীতিমালার না মেনে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো চলছে ২ হাজার ২৭৪টি কেজি স্কুল (কিন্ডার গার্টেন)। প্রাথমিক শাখায় এসব স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখেরও অধিক। বেতন, পরীক্ষাসহ বিদ্যালয়ের সব কার্যক্রমই চলে স্কুল কর্তৃপক্ষের সুবিধা অনুযায়ী। এসব বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। এমনকি প্রতিষ্ঠানে গাওয়া হয় না জাতীয় সংগীতও। ছোট জায়গা ভাড়া নিয়ে আলো-বাতাসহীন ভবনে চলছে ক্লাস-পরীক্ষা। গ্রন্থাগার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
অর্ধশত স্কুলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাসিক বেতন ও সেশন চার্জ ধার্যের ক্ষেত্রে চলে একে-অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এ ছাড়া নেওয়া হয় ইচ্ছেমতো পরীক্ষা, সেখানেও অল্প মার্কের পরীক্ষায় নেওয়া হয় বেশি ফি। এসব স্কুল পরিচালনা করে মালিকপক্ষ লাভবান হলেও নায্য বেতন পান না শিক্ষকরা। ফলে শিক্ষকরা প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টারের প্রতি উৎসাহিত করেন শিক্ষার্থীদের।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর সদরে ১ হাজার ১১, টঙ্গীতে ২৩৫, কালিয়াকৈরে ৩৭২, কাপাসিয়ায় ২০০, কালীগঞ্জে ১৪৬, শ্রীপুরে ৩১০টি কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। এ ছাড়া এর বাইরেও শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
গাজীপুর জেলায় ২০২৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ভর্তিরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৫ জন। এর মধ্যে প্রাক প্রাথমিকে ১ লাখ ১৪ হাজার ৪০৪, প্রথম শ্রেণিতে ৯৫ হাজার ৯৪৬, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৯২ হাজার ৩৪৬, তৃতীয় শ্রেণিতে ৯৪ হাজার ৩৩১, চতুর্থ শ্রেণিতে ৯০ হাজার ৩৪৪ এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৭৯ হাজার ৫৭৪ জন। তাদের মধ্যে ৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে কিন্ডার গার্টেনে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অল্পসংখ্যক স্কুলের রেজাল্ট ভালো হলেও অধিকাংশ দায়সারা ভাব। বিনিময়ে সেসব স্কুলে দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এসব স্কুলে প্রাথমিক ছাড়িয়ে দেওয়া হয় দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান। তারা বিভিন্ন স্কুলের নামে পরীক্ষা দিয়ে থাকে। ফলে নানান অজুহাতে শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা আদায় করা হয়ে থাকে। ক্লাস টেস্ট, মাসিক পরীক্ষার বাইরেও নেওয়া হয় চারটি সাময়িক পরীক্ষা। ফলে এসব খুদে শিক্ষার্থীর সারা বছর থাকে পরীক্ষার বাড়তি চাপ। বিভিন্ন পুস্তক কোম্পানির লোভনীয় অফারে প্রায় প্রতিটি ক্লাসে পড়ানো হয় অতিরিক্ত বই। বেশি দামে এসব বই কিনতে বাধ্য থাকেন অভিভাবকরা।
বিভিন্ন কেজি স্কুলের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব স্কুলের বেতন ২ হাজার থেকে ৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের বেতন আরও কম। অধিকাংশ স্কুলে সকাল সাড়ে আটটা থেকে বিকাল ৩-৪টা পর্যন্ত পরিশ্রম করেন শিক্ষকরা। ফলে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে টিউশন ও কোচিং করতে চাপ দেন।
একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই মানের পড়াশোনা থাকলেও প্রতিষ্ঠান ভেদে শিক্ষার্থীদের খরচের পরিমাণ আলাদা। অনেকটা কাঁচাবাজারের মতো, যার কাছে থেকে যেমন নেওয়া যায়। এ ছাড়া স্কুলের পড়াশোনা পছন্দ না হলে শিক্ষার্থীকে পড়তে হয় সমস্যায়। কখনও কখনও পুরো বছরের টাকা পরিশোধ করে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়।
গাজীপুর কেজি স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুদুর রহমান বলেন, আমাদের সংগঠনে ১ হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণ সাধন করা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদ ভূঁইয়া বলেন, জেলার কিন্ডার গার্টেনগুলো একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসার কাজ চলছে। মোটামুটি সবাইকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তথ্য মোটামুটি দিয়ে দিয়েছে। অনেক স্কুল রয়েছে যারা ইচ্ছামতো বইয়ের চাহিদা দিয়ে বই সংগ্রহ করতেন। এখন আর সেটি পারবে না।