× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নোট গাইড ফোননির্ভরতা বেড়েছে শিক্ষার্থীদের

সেলিম আহমেদ

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৩ ১১:৫৯ এএম

অংলকরণ প্রবা

অংলকরণ প্রবা

মহামারি করোনার বিপর্যস্ত পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। সবকিছু স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেও বাড়ছে না শিক্ষার্থীদের শিখনদক্ষতা। এর প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন শ্রেণিতে পাসের হারে। এই শিখনঘাটতি মেটাতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই টিউশন-কোচিং আর নোট-গাইডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তাদের ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই মধ্যে সবকিছুর দাম বেড়েছে, বেড়েছে শিক্ষাব্যয়ও। বর্ধিত শিক্ষাব্যয় বহন করা দুরূহ হয়ে পড়েছে অভিভাবকদের জন্য। এতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। 

করোনার সময় সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকায় ব্যবহার করা ভার্চুয়াল ক্লাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত। এই শিখনঘাটতি দূর করতে অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও মনোযোগী হওয়ার কথা বলছেন শিক্ষকরা। এই শিখনদক্ষতা বলতে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনকে বোঝানো হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, অতিরিক্ত ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখতে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা, পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। 

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের করোনা-পরবর্তী শিক্ষা পুনরুদ্ধার শীর্ষক ‘এডুকেশন ওয়াচ স্টাডি-২০২২’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের অস্থায়ী ফলাফলের ওপর মতামত দিতে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবে। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী জানান, প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করার পর মতামত জানতে সরকারের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী মাসে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। তবে এই জরিপ নিয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।

বেড়েছে শিখনঘাটতি, ছাপ পড়ছে পাসের হারে 

২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রকোপ দেখা দেয় বাংলাদেশে। তখন থেকে দুই বছর পর্যন্ত এর দাপট ছিল। তখন প্রায় দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এর মধ্যে কিছু সময় ভার্চুয়ালি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরপর ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের ওপর ওই জরিপ চালানো হয়। ওই জরিপে করোনার কারণে শিখনদক্ষতা কমেছে বলে মনে করেন মাধ্যমিকের ৯৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ শিক্ষক এবং প্রাথমিকের ৯৮ দশমিক ২৬ শতাংশ শিক্ষক। 

ছেলে ও মেয়েদের ওপর আলাদাভাবে জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, এই শিখনঘাটতির কারণে পরীক্ষা দিয়ে পরের ক্লাসে উত্তীর্ণ হলেও প্রাথমিকের ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৪০ শতাংশ ছেলের পড়া বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। আর প্রাথমিকের ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মাধ্যমিকের ২৯ শতাংশ মেয়ের পড়া বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। বুঝতে না পারা এই হার শহরের বস্তি এলাকায় আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

করোনার পর শিক্ষার্থীদের শিখনদক্ষতা বা পড়া মনে থাকার প্রবণতাও কমে এসেছে বলে উঠে এসেছে জরিপে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, করোনার আগে তথা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিখনদক্ষতা ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে শিখনদক্ষতার মান ১ থেকে ১০ স্কেলে ধরা হয়েছে। করোনা পর শিখনদক্ষতা বাড়েনি বরং কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশে। আর মাধ্যমিকে শিখনদক্ষতা আগে ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশে।

শিখনঘাটতির এই ছাপ পড়েছে পাসের হারেও। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধানত ইংরেজি, বাংলা ও গণিতে পাসের হার কমেছে। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি এবং গণিতে ন্যূনতম পাস মার্ক ৩৩-এর বেশি পেয়েছে। এর ফলে গ্রেডে তেমন উন্নতি হয়নি। অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজিতে পাস করেনি ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং গণিতে ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর নবম শ্রেণিতে এই হার যথাক্রমে ২৮ ও ৩৪ শতাংশ। গড়ে তিন বিষয়ে পাস করেনি অষ্টম শ্রেণিতে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নবম শ্রেণিতে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

জরিপের তথ্য বলছে, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পাস করেনি এমন শিক্ষার্থীসংখ্যা গড়ে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে অষ্টমে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং নবমে ২৬ দশমিক ২ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছে অষ্টম শ্রেণির মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নরমের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী।

টিউশন-নোট-গাইডে আরও নির্ভরশীল শিক্ষার্থীরা, শিক্ষাব্যয় বৃদ্ধি

করোনার পর শিখনঘাটতি কাটিয়ে উঠতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই প্রাইভেট টিউশন, কোচিং আর নোট-গাইডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শহর এলাকায় ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ, গ্রামে ৮৮ শতাংশ, ক্রমশ শহর হচ্ছে এমন এলাকায় ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ আর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী টিউশন কিংবা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করছে। টিউশনের পেছনে শিক্ষার্থীপ্রতি সর্বনিম্ন আড়াই হাজার থেকে ৯৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। পড়াশোনার এই ঘাটতি দূর করতে প্রাথমিকে ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী নোট-গাইড পড়েছে।

উপায় যখন আসক্তি

করোনাকালে সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকায় ডিজিটাল ডিভাইসে ভার্চুয়াল ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। মহামারি শেষে সেই উপায় এখন আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাবও পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। জরিপ বলছে, ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনে করেন শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মাধ্যমিকে এ হার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। জরিপে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বলছেন, ৯২ ভাগ শিক্ষার্থী এক থেকে দুই ঘণ্টা, ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী দুই থেকে চার ঘণ্টা, প্রায় ১ ভাগ শিক্ষার্থী চার ঘণ্টার বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। মাধ্যমিকের ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী এক থেকে দুই ঘণ্টা, ১২ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থী দুই থেকে চার ঘণ্টা এবং ৬ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী চার ঘণ্টার বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে।

যা বলছেন শিক্ষাবিদরা

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, করোনার কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এটি অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু ঘাটতি মেটাতে সারা দেশের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের বাড়তি ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুই বছরের এ ঘাটতি পোষাতে সময় লাগবে। 

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও এডুকেশন ওয়াচের চেয়ারপারসন কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, করোনার শিখনঘাটতি মেটাতে প্রাইভেট শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এতে শিক্ষাব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের আয় না বাড়ায় ব্যয় নির্বাহ করা দুরূহ হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া করোনায় অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অনেক ছেলে কাজে জাড়িয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট সমাধানের কোনো পথ নেই। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, করোনাকালে শিক্ষার্থীরা যে সাপোর্ট পাওয়ার কথা তা পায়নি, ফলে শিখনঘাটতিতে পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক। করোনার পরবর্তী সময়ে এই শিখনঘাটতি মেটাতে সরকারকে নানা পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। আগের মতো নিয়মমাফিক পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার ফলে শিখনঘাটতির সমাধান হয়নি। শিক্ষার্থীদের এই ঘাটতি আরও বাড়বে।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়া না বোঝার কারণে পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এতে ড্রপ আউট বাড়বে। শিক্ষার্থীরা ভালো ফল না করলে অভিভাবকদেরও নেচিবাচক মনোভাব বাড়বে। মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা শিক্ষার্থীদের পেছনে অর্থ খরচ না করে কর্মে পাঠিয়ে দেবেন। এতে শিশুশ্রমও বাড়বে। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকারের উচিত দ্রুত এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া। 

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পাঠদান স্বাভাবিক হলেও শিখনপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের বন্ধের প্রভাব নিরূপণে এই জরিপ চালানো হয়। ২০২২ সালে প্রথম ৯ মাসের শ্রেণিকক্ষে সরকারি পাঠদানের ওপর ভিত্তি করে চালানো এই গবেষণা জরিপে অংশ নেন ৫ হাজার ৬৯২ শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ও এনজিওকর্মী। এর মধ্যে চতুর্থ, পঞ্চম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ৩ হাজার ৮২১ জন। অষ্টম ও নবম শ্রেণির ২ হাজার ৬৭০ জন। দেশের আট বিভাগের আট জেলা, ২৪ উপজেলা ও তিন সিটি করপোরেশনে ৭২টি গুচ্ছে জরিপ চালানো হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা