কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৬:৪১ পিএম
আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৭:১৪ পিএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ফাইল ফটো
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিকেল সেন্টার সুবিধা চালু হয় ২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও শুরু থেকে যেমন ছিল, এখনও ঠিক তেমনই আছে মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত একটি কক্ষেই কয়েকটি ভাগে বসে শিক্ষার্থীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা। শুধু যে জায়গার সংকট তাই নয়, সংকট রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধেরও।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি কক্ষেই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে পাঁচজন চিকিৎসকের বসার জায়গা। কক্ষের এক পাশে ওষুধ রাখার জায়গা এবং আরেকপাশে দেওয়া হয় রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা। এভাবেই একটি কক্ষকে আট ভাগে ভাগ করে চলছে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। তাছাড়া কর্মরত চিকিৎসকদের দরজায় নেই তাদের কোনো নামফলক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, মেডিকেল সেন্টারে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকার কথা তিনজন কিন্তু রয়েছে একজন, যিনি বর্তমানে সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত। একজন স্টোর কিপার থাকার কথা থাকলেও তা নেই। এছাড়া তিনজন নার্স, দুজন প্যাথলজিস্ট, তিনজন ফার্মাসিস্ট, একজন ডেন্টাল এটেন্ডেন্ট থাকার কথা। কিন্তু উল্লিখিত পদগুলোর কোনো লোকবল নেই মেডিকেল সেন্টারে।
এই নেই গল্পের মধ্যে নেই অ্যাম্বুলেন্স চালকও। অথচ থাকার কথা দুজন। তবে মেডিকেল সেন্টারে অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম ডাটা প্রসেসর পদে নিয়োগ পাওয়া মো. রাজু হাওলাদারের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার বদৌলতে তাকে দিয়ে চালানো হয় চালকের কাজ।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে তাদের চিকিৎসা সেবার জন্য নিয়োজিত আছেন পাঁচজন চিকিৎসক; এর মধ্যে আবার একজন রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। এতে অপ্রতুল জায়গা এবং পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ছুটে যেতে হয় শহরে।
মেডিকেল সেন্টার থেকে সাধারণত প্যারাসিটামল, এন্টিহিস্টামিন, গ্যাস্ট্রিক, ব্যথা, মাথা ঘুরানো, পেট ব্যথা, খাওয়ার রুচির ওষুধ, বমির ওষুধ, স্যালাইনসহ এমন ১০ ধরনের ওষুধ শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা হয়। মাঝে মাঝে বাজেটের সংকুলান হলে শিক্ষার্থীদেরকে অ্যান্টিবায়োটিকও সরবরাহ করা হয়।
তবে প্রায়ই ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। পরিসংখ্যান বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী নুপুর আক্তার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মেডিকেলে অনেকবার ওষুধের জন্য গিয়েছি কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই বলা হয়েছে যে এখন ওষুধ নেই।’ এমনকি চিকিৎসক অনেক সময় ওষুধপত্র সরবরাহ করেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার মাহমুদুল হাসান খান বলেন, ‘আমরা চাই না শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি ওষুধনির্ভর হোক। এক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলোতে ওষুধ না দিয়ে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যায়, সেক্ষেত্রে আমরা ওষুধ দিতে চাই না।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা হচ্ছি স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে আমরা সরকারিভাবে কোনো ওষুধ পাই না। আমাদের যে বাজেট আসে সেখান থেকে আমরা ওষুধের জন্য খরচ করে থাকি এবং তা আমরা বিভিন্ন মেডিকেল কর্নারথেকে নিয়ে আসি। তাছাড়া আমাদের বেক্সিমকোর সঙ্গে এখন কোলাবোরেশনের কাজ চলছে। যদি এটা ঠিকঠাকভাবে হয় তাহলে কমমূল্যে ওষুধ কিনতে পারব।’
জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে মেডিকেল খাতে বাজেট ছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। পরের অর্থবছরে তা বাড়িয়ে দেওয়া হয় ৫ লাখ। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও বরাদ্দ একই বাজেট। এই বাজেটের পুরোটাই ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং যাবতীয় জিনিসপত্র কেনায় ব্যয় হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের চিকিৎসার পাশাপাশি সেখানে শিক্ষার্থীদের মনোরোগের চিকিৎসাও দেওয়া হয়। কোনো ধরনের মানসিক সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আসেন জানতে চাইলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র মেডিকেল অফিসার বেলায়েত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা মূলত ডিপ্রেশন, এংজাইটি, প্যানিক অ্যাটাক, রিলেশনশিপ ক্রাইসিস, ইকোনোমিক ক্রাইসিস ইত্যাদির সমস্যা নিয়ে এখানে আসে। তবে ডিপ্রেশনের সমস্যা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আসে মেয়েরা। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের ডিপ্রেশনের অনুপাত হচ্ছে ২:১।
‘তাছাড়া বডি শেমিংয়ের কারণে সেল্ফ ইস্টিমজনিত সমস্যায় ভোগা- এসব নিয়েও শিক্ষার্থীরা আসেন। তবে বড় ধরনের ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে হাতেগুনা কয়েকজন আসে। বেশিরভাগই আসে ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে।’
চিকিৎসা নিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কেমন এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে ৫-৬ জন শিক্ষার্থী বা মাঝে মাঝে ১৫ দিনে দুইজন শিক্ষার্থী সমস্যা নিয়ে আসে, যার মধ্যে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। এসব সমস্যায় শিক্ষার্থীদের ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি কাউন্সিলিংও করা হয় কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীই কাউন্সিলিং সম্পূর্ণ না করে মাঝপথে চলে যান।’
মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অনাগ্রহী শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে আইকিউএসির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনারের আয়োজন করার প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে প্রত্যেকটা ডিপার্টমেন্টের সিআরদেরকে নিয়ে করা হবে এবং তা ফলপ্রসূ হলে পরবর্তীতে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হবে বলে জানান ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার মাহমুদুল হাসান খান।
এসব বিষয়ে উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. এ.এফ.এম আব্দুল মঈন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাজেট তো মূলত আসে সরকার থেকে। রিভাইস বাজেটে আমরা বাজেট বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম কিন্তু এখন যেহেতু দেশে সংকট চলছে সে দিকটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত এমন বাজেটই দেওয়া হয়ে থাকে।’ এমনকি শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য প্যাথলোজিক্যাল ল্যাবের ব্যাপারেও তিনি অপর্যাপ্ত বাজেটের কথা উল্লেখ করেছেন।