× ই-পেপার প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত ফিচার শিল্প-সংস্কৃতি ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাঠ্যবই রচিত হয় কার ইশারায়

সেলিম আহমেদ

২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ০৯:৪০ এএম । আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৩ ১০:০২ এএম

বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই। ফাইল ছবি

চলতি বছরের নতুন পাঠ্যবইয়ে বেশকিছু ছবি ও পাঠ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তা আমলে নেননি পাঠ্যপুস্তক রচয়িতারা। নির্দেশনার পরও ছাপা বইয়ে কীভাবে সেই বিষয়গুলো থেকে গেল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

একই কথা বলেছেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলামও। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেছেন, মন্ত্রণালয় থেকে যে সংশোধনী দেওয়া হয়েছিল, সেটি আমিও জানি। তারপরও কেন ভুল হলো তা বলতে পারছি না। 

শিক্ষামন্ত্রী ও এনসিটিবির চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যে শিক্ষাবিদরা বলছেন, তাহলে পাঠ্যবই রচিত হয় কার ইশারায়? বিষয়টির খোঁজ করা দরকার।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পাঠ্যবই নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা আমার জীবনেও শুনিনি। পাঠ্যবইয়ের লেখক, সম্পাদক, সম্পাদনা সহকারী, এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতার কারণে এসব হচ্ছে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসগত ভুল থাকবে কেন- এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এত বছর পরও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস শেখাতে পারছি না, তা খুবই দুঃখজনক, অগ্রহণযোগ্য। শিক্ষা খাতকে আমলামুক্ত করা না গেলে এসব ভুল চলতেই থাকবে। কে কোন নিয়তে কোন সিদ্ধান্ত দেন, কে বাস্তবায়ন করেন তা বোঝা বড় দায়।

এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, প্রতিবছর কেন পাঠ্যবই চেঞ্জ করতে হবে। প্রতিবছর কি ইতিহাস পাল্টে যাচ্ছে। নতুন কোনো বিষয় এলে তা সংযোজন করে বই রি-প্রিন্ট হবে। তা না করে প্রতিবছরই নতুন বই লেখা হচ্ছে। তারপর সারা বছর এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কিছু লোক বিষয়টিকে ছেলেখেলায় পরিণত করেছে। এটা ভেবে দেখা দরকার। 

ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এনসিটিবির দায়িত্ব হলো বই প্রকাশ ও বিতরণ করা। সেক্ষেত্রে তারা চরম অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। এবারও ভুল, নিম্নমানের কাগজে বই ছাপা হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। 

আরেক ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, পাঠ্যবইয়ে ভুল ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ভুলের কারণে শিক্ষার মান নষ্ট হচ্ছে। আর এটা হচ্ছে এনসিটিবির খামখেয়ালিপনায়। বারবার কেন ভুল হচ্ছে তার কারণ খুঁজে বের করতে পর্যালোচনা থাকা উচিত। এনসিটিবিতেও একটা পরিবর্তন আনতে হবে। 

চলতি বছরের নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পাওয়ার পর থেকেই প্রায় সব শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে বিভিন্ন ভুল ও পরিবর্তন নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান ‘অনুসন্ধানী পাঠ’ বইয়ের একটি অংশ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এডুকেশনাল সাইট থেকে হুবহু অনুবাদ করে তুলে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছেন বইটি রচনা ও সম্পাদনায় যুক্ত থাকা অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক হাসিনা খান।

এ ছাড়া নবম ও দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’, ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ এবং ‘পৌরনীতি ও নাগরিকতা’ নামক তিনটি বইয়ে মোট ৯টি ভুল চিহ্নিত করে এগুলোর সংশোধনী দিয়েছে এনসিটিবি।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর বাবার নাম ও পদবি, কর্নেল ওসমানী সম্পর্কে ভুল তথ্য, ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়া এবং সপ্তম শ্রেণির ‘ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান’ বইয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার নিয়ে বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

একই শ্রেণির বইয়ের ‘সরকার পরিচালনায় নারী’ অধ্যায়ে তিনজন নারী নেতৃত্বের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী রয়েছেন; রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিও।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সংসদের সাবেক উপনেতা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সংসদ উপনেতা ও সাবেক মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম বা অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতারাও পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ধর্ম অবমাননার কথা বলছেন। 

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে নতুন শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবইয়ে ভুলভ্রান্তি সংশোধন-সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, আমরা কিছু ছবি ও পাঠ বাদ দেওয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কমিটি এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেছে। আমাদের নির্দেশনার পরও সেগুলো রয়ে গেছে। হয়তো সর্ষের মধ্যে কোথাও ভূত আছে।

ভুল সংশোধনে এবং কেন ভুল হলো তা তদন্তে দুটি কমিটি করা হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, একটি কমিটি হবে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে, যারা কাজ করবেন ভুল সংশোধন নিয়ে। শুধু বিষয় বিশেষজ্ঞ না, ধর্ম, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য এমন নানা বিষয়ে যে বিশেষজ্ঞরা আছেন, তাদের নিয়ে আমরা একটা কমিটি করব। আমরা একটা লিংক দিয়ে দেব, দেশ-বিদেশ থেকে আমাদের এই বই নিয়ে যেকোনো মতামত আমাদের জানালে কমিটির মাধ্যমে কোথাও কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধন করা হবে। অন্য কমিটি হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে, যারা এ ঘটনার পেছনে কারও ইচ্ছাকৃত ভুল বা অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছিল কি না তা অনুসন্ধান করবে। 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমি নানা মাধ্যম থেকে পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়ে আলোচনা শুনছি। গণমাধ্যম, রাজনীতির মাঠ, আজকাল সামাজিক মাধ্যম অনেক সরব, সব জায়গা থেকেই আমরা বইয়ের ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা শুনছি। আগেও বলেছি, আমাদের এই বইগুলো নতুন শিক্ষাক্রমে পরীক্ষামূলকভাবে প্রণয়ন করেছি। আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে মতামত পাচ্ছি, সব জায়গা থেকে পাচ্ছি। আমরা শিক্ষার দায়িত্বে যারা আছি, এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা আছি, মানুষের মধ্যে বইগুলো নিয়ে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি।’ 

দীপু মনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব এখন রূপান্তরের কথা বলছে। আমরা এই রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত আছি। রূপান্তরের অংশ হিসেবেই আমরা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করেছি। একটি বছরে এ পাঠ্যবই একেবারে সঠিক করে ফেলা দুরূহ কাজ। এ বছর আমরা বইগুলো পরীক্ষামূলক হিসেবে দিয়েছি। আমাদের পাইলটিং চলছে। সারা বছর আমরা সবার কাছ থেকে মতামত নেব এবং সেখানে পরামর্শ অনুযায়ী পরিমার্জন-পরিশীলনের সুযোগ থাকবে।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভুলটা হয়তো বড়, যা আরও আগেই চিহ্নিত হওয়া দরকার ছিল, সংশোধন হওয়া দরকার ছিল। ভুল, ভুলই। ভুল হলে আমি তা স্বীকার করে নেওয়ার পক্ষে। আগে না হলেও এটি নিয়ে এখন যে আলোচনা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী সংশোধন হচ্ছে, তা আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আমি আশা করব পাঠ্যপুস্তককে ঘিরে কোথাও যেন কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা না হয়।’

পাঠ্যবই থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা বিষয় সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে একটি পক্ষের আলোচনা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কোনো কিছু কারও ধর্ম বা বিশ্বাসে আঘাত দিলে তা নিশ্চয় সংশোধন করা হবে। কিন্তু এসব কথা বলে কেউ যদি মৌলবাদ ছড়ায়, তাহলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা আছে। সংবেদনশীল কোনো বিষয় থাকলে আমরা নিশ্চয় নজর দেব। আওয়ামী লীগ ধর্মবিরোধী বা বিদ্বেষী কিছু কখনও করেনি। কাজেই অনেক অভিযোগ আসতে পারে, সত্যতা থাকলে তা সংশোধন করা হবে।’

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

প্রিন্ট: +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

অনলাইন: +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯, +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]