× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

মানুষ গড়ার কারিগরদের অবসরের পর নতুন যুদ্ধ

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

কর্মজীবন শেষে সবারই চাওয়া থাকে নির্ঝঞ্ঝাট ও শান্তিময় একটি অবসর। কিন্তু দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য এই স্বাভাবিক চাওয়াটুকু যেন চরম বিলাসী এক স্বপ্ন। সারা জীবন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করার পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেদেরই জমানো টাকার জন্য তাদের নামতে হয় নতুন এক যুদ্ধে।

অবসরভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা টাকার জন্য মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তাদের ঘুরতে হয় সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে। পাওনা টাকা কবে মিলবেÑ এই অনিশ্চয়তা নিয়েই দিন কাটে তাদের। অনেকে আবার প্রাপ্য টাকা হাতে পাওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সরকার বদলায়, দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প হয়, কিন্তু লাখো শিক্ষক-কর্মচারীর এই দীর্ঘশ্বাসের কোনো শেষ হয় না।

অপেক্ষার প্রহর ও মানবিক অবমাননা

প্রতিদিনই রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন এলাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। এই ভবনেই অবস্থিত এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যালয়।

সম্প্রতি এই দপ্তরে কথা হয় রাজধানীর জুরাইনের মুরাদপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মতিয়ার রহমানের সঙ্গে। ২০২২ সালের এপ্রিলে অবসরে যান তিনি, মে মাসেই পাওনা টাকার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন বছর পার হলেও এখনও তিনি কানাকড়িও পাননি।

ক্লান্ত ও বিষণ্ন কণ্ঠে মতিয়ার রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘অফিস থেকে বলছে ২০২২ সালের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত আবেদনগুলোর কাজ চলছে। আরও কয়েক মাস লাগবে। এই কয়েক মাসের কথা অবসরের পর থেকেই শুনছি। জমানো পুঁজি দিয়ে একটা ছোট হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয় দিয়েছি, তা থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার টানছি।’

একই অবস্থা ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার উত্তর চেচরী দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আলতাফ হোসেনের। ২০২৩ সালের জুনে অবসরে গিয়ে অক্টোবরে আবেদন করেন তিনি। তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার সিরিয়াল আসতে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে! আলতাফ হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দীর্ঘ চার বছর পর টাকাটা পেলেই বাঁচি। সন্তান বড় হয়েছে, টাকার অভাবে বিয়ে দিতে পারছি না। শেষ বয়সে এসে এমন ভয়ানক অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ব, তা কখনও ভাবিনি।’

সিলেট থেকে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা জানান, তাকেও ডিসেম্বর মাসের পর যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখানে তদবির ছাড়া কাজ হয় না, এ বিষয়ে আমরা আর কথাই বলতে চাই না।’

এ কেমন বঞ্চনা

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের এই টাকা সরকারের কোনো অনুদান বা দয়া নয়। চাকরিকালীন প্রতি মাসে তাদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ অবসর সুবিধার জন্য ও ৪ শতাংশ কল্যাণ সুবিধার জন্য কেটে রাখা হয়। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা (অবসরের জন্য ৭০ ও কল্যাণের জন্য ৩০ টাকা) নেওয়া হয়। অর্থাৎ, শিক্ষকরা চাকরিজীবনে নিজেদের যে অর্থ জমা রাখছেন, অবসরে গিয়ে সেই টাকা তুলতেই তাদের পদে পদে অপমানিত হতে হচ্ছে।

উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছেÑ শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার টাকা অবসরে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনার ন্যূনতম প্রতিফলন নেই।

পাহাড়সম আবেদন ও তহবিলের চরম সংকট

অনুসন্ধানে জানা যায়, দুটি দপ্তরেই এখন পেন্ডিং তথা অনিষ্পন্ন আবেদনের পাহাড় জমেছে। অবসর সুবিধা বোর্ডের তুলনায় কল্যাণ ট্রাস্টের কাজ কিছুটা এগিয়ে থাকলেও সার্বিক চিত্র ভয়াবহ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবেদনের এই জট ও ধীরগতির মূল কারণ হলো প্রকট অর্থসংকট ও লোকবল ঘাটতি। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দেড় হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ছে, যা বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজারে দাঁড়ায়।

অবসর সুবিধা বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আটকে থাকা আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করতে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নগদ টাকার পরিবর্তে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছিল, যা থেকে ছয় মাস পর পর শুধু লভ্যাংশ পাওয়া যাবে। বর্তমান সরকার এখনও বড় কোনো থোক বরাদ্দ দেয়নি। অন্যদিকে, কল্যাণ ট্রাস্টের ঘাটতি প্রায় ২ হাজার ৮১৩ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এই পরিমাণ বরাদ্দ চাওয়া হলেও তা মেলেনি। এর বদলে মাত্র ২০০ কোটি টাকার বন্ড দেওয়া হয়েছে, যার মুনাফা হিসেবে কয়েক মাস পর পর আসবে মাত্র ১৫০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা। বিশাল চাহিদার তুলনায় এটি নিতান্তই অপ্রতুল।

যা বললেন কর্মকর্তারা

দীর্ঘ সময় ধরে এই দুই প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ কোনো বোর্ড ছিল না। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

অবসর সুবিধা বোর্ডের নতুন সচিব মো. মোশাররফ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘তহবিলের কোনো অভাব নেই। আটকে থাকা কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে আমরা দিনরাত কাজ করছি। কাজের গতি বাড়াতে সনাতন পদ্ধতির বদলে পুরোপুরি সফটওয়্যারভিত্তিক কাজ করার প্রক্রিয়া চলছে। এটি সম্পন্ন হলে সেবাগ্রহীতারা দ্রুত সেবা পাবেন।’

অন্যদিকে, কল্যাণ ট্রাস্টের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আবদুর রহিম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ২০২৩ সালের মে-জুন মাসের কাজ শেষ করেছি। জুলাই-আগস্টের কাজও শেষের পথে। ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে আটকে থাকা ২৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির জোর নির্দেশনা রয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।’

তবে ভুক্তভোগী শিক্ষক ও কর্মচারী সমাজের মতে, শুধু দাপ্তরিক গতি বাড়িয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ। শিক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হচ্ছে, অথচ যাদের হাত ধরে শিক্ষার ভিত তৈরি হয়, সেই শিক্ষকদের শেষ জীবন কাটছে চরম বঞ্চনায়Ñ এটি কোনোভাবেই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উদাহরণ হতে পারে না। নীতিনির্ধারকরা যদি অবিলম্বে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তবে লাখো শিক্ষকের এই দীর্ঘশ্বাস দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই এক লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা