প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৭:১৬ পিএম
আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:০০ পিএম
নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়েছে সরকার। এতে আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে মেতেছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: প্রবা
মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর দেশে বই উৎসব হয়নি। করোনা নিয়ন্ত্রণে এলেও নানা সংকটের মধ্যে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে সব সংকট কাটিয়ে অবশেষে আড়ম্বরপূর্ণভাবে সারা দেশে বছরের প্রথম দিন রবিবার (১ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হলো বই উৎসব। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন বই। আর এই বই পেতে সকালের শীত উপেক্ষা করে নিজ নিজ স্কুলে হাজির হয় শিক্ষার্থীরা। তাদের হাতে এখন শোভা পাচ্ছে নতুন বই। শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে এই বই পেয়ে আনন্দিত, উদ্বেলিত কোমলমতি শিশুরা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৩৩ কোটি ৯১ লাখ ১২ হাজার ৩০০ পাঠ্যপুস্তক বিতরণের কথা ছিল।
২০২৩ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে সারা দেশে স্কুলগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের হাতে এসব বই বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাহিদার বিপরীতে শিক্ষার্থীদের হাতে সব তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ প্রাথমিকের ৩৪ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২২ শতাংশ বই এখনও ছাপাই হয়নি।
এদিন গাজীপুরের কাপাসিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাধ্যমিক পর্যায়ের বই উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন উদ্বোধন করেন প্রাথমিকের বই উৎসব। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন।
বাগেরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে জেলায় বই উৎসবের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান। বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে খুশি অভিভাকরাও।

নতুন বই পাওয়া তৃতীয় শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ মুনহা বলেন যে, ‘নতুন বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়ে খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, ঈদের থেকেও বেশি আনন্দ লাগছে।’
একই শ্রেণির আয়ান তরফার বলেন, ‘সবাই এক সঙ্গে বই পেয়েছি আমরা। সবাই আনন্দ করছে। সবাইকে এক সঙ্গে বই দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুশরাত জাহান বলেন, ‘নতুন বছর, নতুন স্কুল ও নতুন বই সব মিলিয়ে খুব ভালো লাগছে। আজকে সারা দিন এই বই নিয়েই আমার দিন কাটবে।’
অভিভাবক বাবুল হোসেন বলেন, ‘আমরা যখন পড়াশুনা করেছি তখন বই কিনে পড়তে হতো। বছরের প্রথম দিনে নতুন বইয়ের কথাতো চিন্তাই করা যেত না, মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে বই কিনতে হতো। কিন্তু বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়ে আমাদের বাচ্চারা খুব খুশি হয়েছে। আমরাও খুশি হয়েছি। মনে হচ্ছে সবার মধ্যে ঈদ আনন্দ বিরাজ করছে।’
শুধু বাগেরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নয়; সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, আদর্শ বিদ্যালয়, বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়সহ জেলার বেশিরভাগ প্রাথমিক, মাদ্রাসা, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উৎসব মুখর পরিবেশে বই বিতরণ করা হয়েছে।
এদিন জেলার মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ৭২৯ টি বই বিতরণ করা হয়েছে।
বাগেরহাটের মতো বই উৎসবের রং ছড়িয়েছে জেলায় জেলায়। নতুন বইয়ের গন্ধে মাতাল বগুড়ার বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে বই নিতে আসা শিক্ষার্থী রেবেকা সুলতানা। সে বলে, ‘নতুন বইয়ের গন্ধে অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে। বাবার সঙ্গে বই নিতে এসেছিলাম। আশা করছি, নতুন বইয়ে এ বছর অনেক ভালো পড়াশুনা করব।’
বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সুস্ময় সরকার বলে, ‘নতুন বছর শুরুর দিন বিনামূল্যে বই পেলাম। অনেক খুশি লাগছে।’
এই স্কুলে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন বছরের শুরুতেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দেওয়া। বছরের প্রথম দিনেই তুলে দিতে আমরা যেমন খুশি, তেমনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।’

বগুড়া জেলার প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম (মাদ্রাসা ও কারিগরি এবং ইংরেজি মাধ্যম) শ্রেণি পর্যন্ত ৯ লাখ ১৩ হাজার ৫৭০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বইয়ের চাহিদা ৭৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৪৭টি। এর বিপরীতে বছরের শেষ দিন পর্যন্ত জেলায় বই পৌঁছেছে ৫৫ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৪টি। অর্থাৎ বইপ্রাপ্তির হার শতকরা ৭৪ দশমিক ৪২ ভাগ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, প্রাথমিক (প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি) শ্রেণির ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯২ জন শিক্ষার্থীর জন্য বইয়ের চাহিদা রয়েছে ২০ লাখ ২ হাজার ২১২টি। এর মধ্যে বিতরণের জন্য এসেছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৯১টি। চাহিদার বিপরীতে ৬২ দশমিক ২৯ ভাগ প্রাথমিকের বই এসেছে।
অপরদিকে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, ষষ্ঠ থেকে নবম (দাখিল, এবতেদায়ি, কারিগরি, ট্রেড, ইংরেজি ভার্সন ও ব্রেল ভার্সন) শ্রেণির ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য বইয়ের চাহিদা রয়েছে ৫৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬৩৫ বইয়ের। এর বিপরীতে শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত ৪২ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৩টি বই অর্থাৎ ৭৯ শতাংশ বই মিলেছে।
জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতেই নতুন বই তুলে দেয়া হবে। ধাপে ধাপে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের নতুন বই পাবে। এখানে কেউ বাদ পড়বে না।’
গোপালগঞ্জে বিভিন্ন স্কুলে প্রাথমিকে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৭টি বই এবং মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও ভোকেশনালে ১৭ লাখ ৭১ হাজার ১১১টি বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বই পেয়ে উৎফুল্ল এখানকার শিক্ষার্থীরাও।
শহরের এস এম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহাদিয়া হোসেন সোহান বলে, ‘নতুন বই পয়ে আমরা খুব খুশি। বছরের প্রথম থেকেই বই পড়তে পারব।’
একই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির দিশা বাইন বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে নতুন বই নিতে স্কুলে এসেছি। নতুন বই পেয়েছি। আমার খুব ভালো লাগছে।’
বীণাপানি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মৃন্ময় বাড়ৈ বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়ে ১১’শ শিক্ষার্থী রয়েছে। আজ যারা অনুপস্থিত রয়েছে তারা বাদে সব শিক্ষার্থীকে বই দেওয়া হয়েছে। আর যারা বাকি আছে তাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে।’

বইয়ের পরিবর্তে খাতা
সাতক্ষীরায় এক হাজার সাতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অজিত কুমার সরকার। তবে প্রাক প্রাথমিকের ৩৮ হাজার ১৪১ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি করে বই বরাদ্দ থাকলেও তা হাতে না পাওয়ায় আজ সবাইকে একটি করে খাতা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছয়টি করে বই দেওয়ার কথা থাকলেও ঘাটতি থাকায় দেওয়া হয়েছে ৩টি করে বই।
তবে আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ক্লাসে ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের হাতে বাকি সব বই তুলে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিকে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজী, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ইসলাম শিক্ষা বই ছাড়া আর কোনো বই হাতে পায়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। আর নবম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজী ও অংক বই এখনও পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরায় এবার ৩০৮টি মাধ্যমিক ও কলেজিয়েট স্কুল, ২১৫টি দাখিল মাদ্রাসায় দুই লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থীর হাতে ৩০ লাখ ৮০ হাজার নতুন বই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১০৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই লাখ ৩৮ হাজার ৪৬৫ জন প্রাথমিক, প্রাক প্রাথমিক ও এবতেদায়ি শিক্ষার্থীকে সাত লাখ ১৫ হাজার ৩৯৫টি নতুন বই দেওয়া হয়েছে।