শিক্ষা খাতের বাজেট
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মেনে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে ইউনেস্কো। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দের হার সব সময় অপ্রতুল।
তবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মেনে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতের বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
শিক্ষা গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত বিভিন্ন অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে ২ শতাংশ বা তার একটু বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমে ২ শতাংশের অনেক নিচে নেমে আসে। এবারও তাই হবে কি না; তা বাজেট পাস হলে বোঝা যাবে।
তবে আগের চেয়ে এবার যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে; সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের পুরো টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে সরকার তাদের ওয়াদার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। কিন্তু বাজেট দেওয়া তো বড় কথা নয়। সরকার বাড়তি টাকা কীভাবে কাজে লাগাবে, সেটা দেখার বিষয়। যদিও সরকার বিচ্ছিন্নভাবে কারিকুলামে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কারিকুলাম সংস্কারসহ নানা পদক্ষেপের কথা বলছে; যার অনেকগুলো খণ্ডিত। যেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে, তার কোনো সুপরিকল্পিত রূপরেখা নেই। ফলে বাজেটের পুরো টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছেÑ এটা সবার জন্য খুব গুরত্বপূর্ণ- তা কিন্তু নয়। এটা সবার শেখার প্রয়োজনও নেই। ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা; এটাও সে রকম। সরকার যে পদক্ষেপ নিতে পারত তা হলোÑ শিক্ষকদের ভালো করে তৈরি করা, শ্রেণিকক্ষ ও পাঠদানের জন্য সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি। দুর্নীতিপ্রবণ রাষ্ট্র কাঠামোয় বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক নয়-ছয় ঘটে। সেটা কমিয়ে আনতে হবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে যে সংকট ছিল, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে এই বাজেট। সামাজিক সুরক্ষা খাতে এবার সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। কীভাবে তা উন্নীত করা হবে, তার একটা রূপরেখা চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষা বাজেটের রেশিও বাড়ছে এটা সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতের আমূল পরিবর্তন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। এই বাজেটের পরে সেটা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
তিনি বলেন, আগে যে বাজেট দিত তার সব কিন্তু খরচ হতো না। এজন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক এই বাজেট কাজে লাগাতে হবে। কারণ বাজেট রেডি হয়ে আসতে দু-তিন মাস লেগে যায়। আর জুনের আগে তাড়াহুড়ো লাগে বাজেট খরচ করার জন্য।
এবার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জন্য ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাকি ১৪ হাজার ১১১ কোটি টাকা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে বরাদ্দ হয়েছে। আর তুলনামূলক বিচারে গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকার (জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ) চেয়ে এবার এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।