সেলিম আহমেদ
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:২৯ পিএম
আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:৫৬ পিএম
দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজের সভাপতি পদে আমলাদের বসানোর চিন্তাভাবনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যেই এমন প্রস্তাব রেখে ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২২’ প্রস্তুত করার কাজ শুরু করেছে তারা। তবে প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আগে মতামত চেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সব শিক্ষা বোর্ডে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় গণমান্য ব্যাক্তিদের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়। এখানে নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকার তাদেরই। আমলাদের বসালে এর ফল ভালো হবে না। আবার আমলারা সর্ব কাজের কাজী হলে তা দেশের সর্বনাশ ডেকে আনবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি মাধ্যমিক শাখা থেকে গত ২০ ডিসেম্বর শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা, ২০২২’ প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত উপসচিব বা সমমানের কর্মকর্তা (পঞ্চম গ্রেডভুক্ত) এবং ‘ম্যানেজিং কমিটি'র সভাপতি হিসেবে একজন সরকারি কর্মকর্তা বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা সে বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে।
ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘শুনেছি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখনও হাতে পাইনি। চিঠিটি পড়লে মন্তব্য করতে পারব।’
একই বক্তব্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন ও সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রমা বিজয় সরকারের। তারা চিঠি হাতে পেলে মতামত দেবেন বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান।
শিক্ষাবিদদের তীব্র সমালোচনা
সরকারের এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমলা ছাড়া দেশ চলবে না—এটা ঠিক। কিন্তু আমলারা যখন সর্বকাজের কাজী হয়ে যায় তখনই দেশের সর্বনাশ হয়। পাকিস্থান তার একটা জ্বলন্ত প্রমাণ। সুতরাং আমলারা আমলাদের কাজ করুক। শিক্ষাবিদরা শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকুক। তবে যোগ্য আমলা হলে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সব জায়গায় আমলা বসাতে হবে এই সংস্কৃতি থেকে আমরা যতদিন না বের হতে পারর, বাংলাদেশের যে সম্ভাববনা আছে সেটা পুরোপুরি অনুভব করতে পারব না। দেশে আমলাদের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে গেছে।’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদে শিক্ষাবিদদেরই থাকা উচিত বলে দৃঢ় সিদ্ধান্তের কথা জানান জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান।
ঢাকা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান জিয়াউল হক বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে চর্চা হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং কমিটির সভাপতি নির্বাচনের মাধ্যমে হওয়া। সেক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা আমি জানি না। যদি নির্বাচনের বিষয়টি বাতিল করে দেওয়া হয় তখন বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। তবে এর ফল খুব একটা ভালো হবে না।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের একটি প্রথা হচ্ছে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিরা এসব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের সহায়তায় পরিচালিত হয়। তাই কমিটির সদস্য কিংবা সভাপতি হওয়ারও অধিকার তাদের থাকে। এখন যদি তাদের বাদ দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে হয়ত তাদের সহায়তা না পাওয়া যেতে পারে।’
গত অক্টোবর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট এবং মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালনা কমিটিতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) চিঠি দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা।