বিবিএসের জরিপ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:০০ এএম
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবায় স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি রয়েছে। জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুলে প্রতি ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নেই। মাত্র ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ স্কুলে উন্নতমানের টয়লেট রয়েছে। এ ছাড়া নিরাপদ মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
রবিবার (২১ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিসংখ্যান ভবনের সম্মেলন কক্ষে ‘ওয়াশ ইন এডুকেশন অ্যান্ড হেলথকেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’ শীর্ষক জরিপ প্রকাশ করা হয়। বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার ও বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী।
জরিপের তথ্য বলছে, নিরাপদ মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পেরেছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ স্কুল এবং ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। ফলে দেশের অধিকাংশ শিক্ষাকেন্দ্র ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে মানববর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে অথবা ঝুঁকিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে। এতে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
জরিপের বড় একটি চিত্র হলো, উন্নত পানির উৎসে প্রবেশগম্যতা তুলনামূলকভাবে বেশিÑ ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশ স্কুল এবং ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান উন্নত পানির উৎসে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী পানি সেবা তখনই মৌলিক বলে গণ্য হয়, যখন সেই উন্নত পানির উৎস প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণের ভেতরে থাকে এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য হয়। এই সংজ্ঞা পূরণ করতে পারছে ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ স্কুল এবং ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।
আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও সেবাগ্রহীতাদের উপযোগী পানির উৎস ও প্রবেশগম্যতা। স্কুল পর্যায়ে এই সুবিধা রয়েছে মাত্র ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হার আরও কম ৪০ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে দেশের অনেক শিক্ষার্থী ও সেবাগ্রহীতা মৌলিক পানি সেবা থেকেও বঞ্চিত থাকছেন।
স্যানিটেশন খাতে অর্থ বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত। জরিপ বলছে, ওয়াশ খাতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১১ দশমিক ১ শতাংশ স্কুল এবং ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে। উন্নত পানির উৎসের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যমান সুবিধার টেকসইতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে টয়লেট সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও এর ব্যবহারযোগ্যতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পানি-সাবান সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। দেশের ৯০ দশমিক ৬ শতাংশ স্কুল এবং ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি টয়লেট আছে। তবে মৌলিক হাত ধোয়া সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছে মাত্র ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ স্কুল এবং ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।
তা ছাড়া নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য সহায়তা অত্যন্ত সীমিত। জরিপে দেখা গেছে, দেশের স্কুলগুলোর মাত্র ২০ দশমিক ৭ শতাংশে কিশোরীদের জন্য পৃথক, নিরাপদ টয়লেট রয়েছে। মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক সুবিধা আছে। ফলে কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়, তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি কমে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বাড়ে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি রয়েছে। স্কুলগুলোর ৭৮ দশমিক ৩ শতাংশ উপযুক্ত কঠিন বর্জ্য নিষ্পত্তির দাবি করলেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বিপজ্জনক চিকিৎসা বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারেÑ এমন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অত্যন্ত কম। জরিপে দেখা যায়, ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ায়। এই প্রক্রিয়া পরিবেশ দূষণ ছাড়াও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ওয়াশ অবকাঠামো প্রাকৃতিক দুর্যোগ টেকসই নয়Ñ এমন তথ্যও উঠে এসেছে। গত ১২ মাসে ২৪ দশমিক শূন্য শতাংশ স্কুল এবং ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখে পড়েছে। পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার বিষয়ে অবগত প্রতিষ্ঠানের হারও খুব কমÑ স্কুলে মাত্র ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। বাস্তবায়ন আরও কম পরিসরে আছে।
এই জরিপ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, হাত ধোয়ার সুবিধা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুতর সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোগ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।