সাক্ষাৎকার : ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৬ পিএম
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:৪২ পিএম
প্রবা ফটো
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা, র্যাংকিং, সামগ্রিক পরিবেশ, কর্মমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক আহমাদ আরিফ
আমাদের দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ই গতানুগতিক ধারার। এখান থেকে বেরিয়ে বিশ্বমানে উন্নীত হতে হলে পৃথিবীর উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেরকম করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী। এনএসইউ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে উপাচার্য ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘এনএসইউ শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছে আর পড়াচ্ছে বিষয়টি এমন নয়, বরং আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছি। তরুণদের মধ্যে জীবন দর্শন সৃষ্টি করছি, যাতে প্রত্যেকেই আগামীদিনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে নিজেদের তৈরি করে। কেননা বড় চাকরিজীবী, বড় ব্যবসায়ী বা বড় রাজনীতিবিদ হতে হবে বিষয়টি এমন না, আমরা চাই প্রত্যেকেই তার কর্মস্থলে সফল হোক। ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। জীবনে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কল্যাণমূলক কাজ করা। প্রত্যেকের মধ্যে সেই বোধের জন্ম হোক।’
তিনি বলেন, ‘এনএসইউর দীর্ঘ ৩৫ বছরের যাত্রার একেবারে শুরুতে চিন্তা ছিল শুধু শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়ালেখা করাব। এখন সে চিন্তা বদলে গেছে। বর্তমানে শিক্ষকদের গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার অগ্রগতি ও অর্জনের মধ্যে দিয়ে আন্তর্জাতিকীকরণের বিষয়টি চলে এসেছে। বিশ্বের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার প্রসঙ্গও দেখা দিয়েছে। তাই এসব দিকে আমাদের মনযোগী হতে হচ্ছে। এ বছর এনএসইউর বড় অর্জন হচ্ছেÑ বিদেশি কোম্পানিগুলোর ফান্ড নিয়ে গবেষণাসহ ৫টি প্রকল্প পরিচালনা করা। তা ছাড়াও আমাদের বিদেশি সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রকল্প রয়েছে। নর্থ সাউথ কো-অপারেটিভ ও কোলাবরেট মুডে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে; যা তরুণদের আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের অর্জন বর্তমানে অনেক ওপরে। প্রতি বছর শিক্ষকদের অসংখ্য পাবলিকেশনস হচ্ছে। এসব পাবলিকেশন বিশ্বের নামকরা জার্নালে প্রকাশিত হয়ে শুধু নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের সুনামও বয়ে আনছে। বাংলাদেশ থেকে গবেষণালব্ধ জ্ঞান বিশ্বের জার্নালগুলোতে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে বিশ্ববাসীও সমৃদ্ধ হচ্ছে। আমরা মূলত বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রয়োজনীয় পলিসি ও নানা সমস্যাকে সামনে রেখে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার ফলে প্রতি বছর র্যাঙ্কিং বাড়ছে। এবারও ইউএস র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০০ পয়েন্ট ছাড়িয়ে এশিয়ার ১৪৯তম বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছি। এশিয়ায় হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোর মধ্যে এনএসইউ ১৪৯তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এতেই বোঝা যায় আমাদের গবেষণা ও শিক্ষাকার্যক্রম বিকশিত হচ্ছে এবং বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও গবেষকদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।’
অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এআই ল্যাবকে আরও অনেক সুন্দর করে সাজাচ্ছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও সহায়তা পাচ্ছি। রোবোটিক্স ল্যাবে সংযুক্ত শিক্ষকদের কার্যক্রমও উন্নত গবেষণা ও পাবলিকেশন নিয়ে আসবে। যার মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং এশিয়া মহাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ভালো হবে।’
শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় জন্মলগ্ন থেকেই জেনারেস বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকের ভাবনা এখানে শুধু ধনীদের সন্তান পড়ে, টাকা থাকলেই এখানে পড়া যায়। বিষয়টি আসলে তা নয়। বরং নর্থ সাউথ সব সময় মেধাকে প্রাধান্য দেয়। মেধাভিত্তিক ক্রুশিয়াল এডমিশন টেস্ট দিয়ে মেধা যাচাই করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। ধনী-গরিবের সন্তান হিসেবে বিচার করা হয় না। এখানকার ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা মিডিয়াম ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসেছে। আমরা মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে থাকি। এখানে ১৭০০ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে ফ্রি পড়ানো হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের শতাধিক শিক্ষার্থীকে ফ্রিতে পড়ানো হচ্ছে। অভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার খরচ বহন করেছি। শিক্ষারত অবস্থায় বাবা-মা মারা গেলে সেসব শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদেরও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। মূলত মেধার যোগ্যতা দিয়েই তারা ফাইনান্সিয়াল এইডে স্থান করে নেয়। এ সুযোগ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত।’
বর্তমানে ২২টি দেশের শিক্ষার্থীরা এনএসইউতে অধ্যয়ন করছে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা আরও বেশি দেশের শিক্ষার্থীদের আনতে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এ বছর নতুন করে একটি স্কলারশিপ চালু হয়েছে তাতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা টিউশন ওয়েভার পাবে ও মাসিক ব্যয়ের জন্য অর্থও পাবে। এ সেমিস্টারেই ১৭ জন শিক্ষার্থী সেটি পাওয়া শুরু করেছে। এই অর্থে প্রত্যেকেই ঢাকায় তার ব্যয় সরবরাহ করতে পারছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ৩০ জন বিদেশি শিক্ষক আনা হয়েছে। তারা নানা পার্সপ্রেকটিভ এখানে আনে যা শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এতে বাংলাদেশের ভেতরে থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ মিলছে। দেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আন্তর্জাতিক মানসিকতা গড়ে উঠছে।’
আবাসন বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের নতুন ক্যাম্পাসে (পূর্বাঞ্চল) হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে। সাড়ে ৩০০ বিঘা জমিতে অচিরেই আমাদের উন্নয়নকাজ শুরু হবে। সেখানে শিক্ষার্থীর আবাসন হবে। বর্তমানে বসুন্ধরায় প্রাইভেট কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য আবাসন রয়েছে। তারা ইচ্ছা করলে পরে স্থান বদলাতে পারবেন।’
কর্মসংস্থান গড়তে প্রত্যেককেই গাইড করা হয় উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে পড়ালেখার দিক দেখা হয়। শিক্ষার্থীরা কোন সেক্টরে যাবেÑ সেই মোতাবেক ফেসিলিটিস রয়েছে। অনেকেই চাকরিতে যেতে চায়, কেউবা উদ্যোক্তা হতে চায়। প্রত্যেকের কেরিয়ার গাইডলাইন দেওয়া হয়। আগামীতে সে কোন দিকে যাবে, তার দিকনির্দেশনা দিতে ক্যারিয়ার সার্ভিস রয়েছে। সবাই চাকরির জন্য পড়তে আসে বিষয়টি তা না পড়ালেখা শেষ করে অনেকের দৃষ্টিকোণ বদলে যায়। কেউ চাকরির সন্ধানে থাকে, কেউ বিদেশে যায়, আবার কেউ কেউ গবেষণা ভিত্তিক কাজে যুক্ত হয়। এতে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যারিয়ার বিল্ডআপ করতে পারে। উন্নত বিশ্বে পাঠাতে বিদেশি কিছু প্রকল্পও রয়েছে। জাইকা, চীনসহ বেশকিছু দেশের ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সে অনুযায়ী চুক্তিও রয়েছে। উদ্যোক্তা তৈরিতে নর্থ সাউথ অর্থায়ন করে। তারা উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।’