ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:২৮ পিএম
আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ২৩:৪৩ পিএম
প্রবা ফটো
আইইউবিএটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাফল্য, অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা দিক নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক আহমাদ আরিফ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন একেবারেই একটি নতুন ধারণা, তখন এ দেশে এমন প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি) প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। ১৯৯১ সালে ড. এম আলিমউল্যা মিয়ানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে অধ্যাপক ড. আব্দুর রবের মতো দূরদর্শী শিক্ষাবিদের নেতৃত্বে উচ্চশিক্ষার মানচিত্র বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি, ব্যবসা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে এক অনন্য পাঠ্যক্রম নিয়ে আইইউবিএটি কীভাবে এগিয়ে চলেছে, জাতীয় উন্নয়নে এর ভূমিকা কী, এর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনাই-বা কীÑ সেসব বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব।
মেধা ও মানের সমন্বয় আইইউবিএটির বড় গৌরব
আইইউবিএটি দেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে মেধা এবং মানের সমন্বয়ও ঘটেছেÑ এটা এ প্রতিষ্ঠানের বড় গৌরব। তবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রব কেবল ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তিনি বলেন, ‘আইইউবিএটির অন্যতম প্রধান অর্জন হলো স্বল্প ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। আমরা শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখি, কোনো পণ্য হিসেবে নয়। আমাদের অর্জন শুধু ডিগ্রি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দক্ষ ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানবসম্পদ তৈরি করা।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘গবেষণা ক্ষেত্রে আইইউবিএটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে প্রায়োগিক জ্ঞানের ওপর। বিশেষত কৃষি, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগে এমন সব গবেষণা চলছে যা দেশের স্থানীয় সমস্যা সমাধানে সরাসরি সহায়তা করছে। আইইউবিএটির শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করছেন এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গবেষণামূলক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইইউবিএটির সাফল্য
আইইউবিএটি আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য। তিনি বলেন, আইইউবিএটির পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমাদের অনেক সাবেক শিক্ষার্থীই বর্তমানে বিশ্বের নামিদামি বহুজাতিক কোম্পানি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা : মানবিকতার দর্শন
অধ্যাপক ড. আব্দুর রবের মতে, আইইউবিএটির মূল দর্শন হলো ‘শিক্ষাই আলো’। এই দর্শনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, আর্থিক দুর্বলতা কোনোভাবেই মেধা বিকাশের পথে বাধা হতে পারে না। তাই আইইউবিএটির মোট শিক্ষার্থীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন ধরনের স্কলারশিপ ও আর্থিক সুবিধা লাভ করে।’
সুযোগ-সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আধুনিক ক্লাসরুম, উন্নত ল্যাবরেটরি, সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, দ্রুত ইন্টারনেট সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হোস্টেল সুবিধা। তবে এর বাইরেও আইইউবিএটির বিশেষ দিক হলো সহশিক্ষা কার্যক্রম। এখানে ক্রীড়া, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক ক্লাব এবং সামাজিক কাজের জন্য প্লাটফর্ম রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক ও নেতৃত্ব গুণাবলী বিকাশে সহায়ক। উপাচার্য জোর দিয়ে বলেন, ‘একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি এই মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রমগুলো অপরিহার্য।’
কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়ার বেসরকারি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত কৃষি বিজ্ঞান পড়ানো হয় না। কিন্তু আইইউবিএটি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই কৃষিকে প্রাধান্য দিয়েছে। এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের কারণ জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. রব বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য দক্ষ কৃষি বিজ্ঞানীর ব্যাপক প্রয়োজন। বেসরকারি খাতে কৃষিশিক্ষাকে আনা একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় চাহিদা পূরণ করা।’
কৃষি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাড়া প্রসঙ্গে উপাচার্য অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘কৃষি বিজ্ঞান আমাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় কোর্সগুলোর অন্যতম। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে যে এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, যেখানে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই চাকরির সুযোগ নিশ্চিত। বিশেষত বিদেশেও আমাদের কৃষি গ্রাজুয়েটদের উচ্চ চাহিদা রয়েছে।’
সফল কর্মজীবনের জন্য জব প্লেসমেন্ট সেল
একজন শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সফল কর্মজীবন। এই ক্ষেত্রে আইইউবিএটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপাচার্য জানান, ‘আমরা একটি সক্রিয় প্লেসমেন্ট সেল পরিচালনা করি। এই সেল শিক্ষার্থীদের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু থেকেই কাজ করে।’
তিনি জানান, ‘এই সেলের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে প্রথমত, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের তাদের আগ্রহ ও দক্ষতার ভিত্তিতে সঠিক পথ বেছে নিতে সহায়তা করা; দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অর্থাৎ ইন্টারভিউ টিপস, রেজ্যুমে তৈরি এবং সফট স্কিল উন্নয়নে কর্মশালার আয়োজন করা; তৃতীয়ত, ক্যাম্পাস রিক্রুটমেন্ট অর্থাৎ দেশের স্বনামধন্য করপোরেট হাউস এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ক্যাম্পাসে এনে শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ করে দেওয়া; চতুর্থত, ইন্ডাস্ট্রি লিংক অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট এবং ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা প্রদান করা।’
অধ্যাপক ড. আব্দুর রব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আইইউবিএটি থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯৫ শতাংশ গ্র্যাজুয়েশনের অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরি বা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে যায়।’ তার মতে, ‘আইইউবিএটি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরির মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।’
এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. আব্দুর রব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কেবল কৃষি বা প্রযুক্তি নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমন্বিত দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা। আমরা চাই আইইউবিএটি যেন শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ করে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং ম্যানেজমেন্ট সবাই একযোগে কাজ করছে।’