অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান মহাস্থানগড়ের সন্নিকটে বগুড়া সদর উপজেলার অন্তর্গত গোকুল এলাকায় প্রায় ৯ একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি। একটি বৈচিত্র্যময়, নৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ করছে। নতুন শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের জন্য এখানে গবেষণা এবং বৃত্তিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
‘পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ স্থাপিত হয় ২০০১ সালে। প্রাচীন সভ্যতার সূতিকাগার পুণ্ড্রবর্ধনের নামানুসারে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়। পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি ‘জাতীয় উন্নয়নে এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিদ্যানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন’ এই ভিশন নিয়ে কাজ করছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষাসহ শিক্ষার্থীদের সব শাখায় সমৃদ্ধ করার মিশন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেÑ যাতে শিক্ষার্থীদের গবেষণাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মে আগ্রহী করে তোলা যায়, নেতৃত্ব দানের যোগ্য করে তোলা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চারটি অনুষদের অধীনে ১৯টি প্রোগ্রাম চলছে। প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে সিএসই, ইইই, সিভিল, ইনফরমেশন ও কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং; বিবিএ, ইংরেজি, বাংলা, ইসলামিক স্টাডিজ (অনার্স) ও এমএ ইংরেজি, ইসলামিক স্টাডিজ; এমবিএ, ইএমবিএ, এমডিএস, এমপিএইচ, বিএড ও এমএড অন্যতম। সম্প্রতি চালু হয়েছে চার বছর মেয়াদি এলএলবি ও জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ (অনার্স)। সমাজবিজ্ঞান ও ফার্মেসিসহ আরও অধিক চাহিদা সম্পন্ন বিভাগগুলো চালু করার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অত্যন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত সবুজে ঘেরা ও নিরিবিলি পরিবেশে ২০ তলাবিশিষ্ট একটি, পাঁচতলাবিশিষ্ট তিনটি, একতলাবিশিষ্ট দুটি একাডেমিক ভবন এবং তিনতলাবিশিষ্ট একটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব ভবন নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি আরও রয়েছে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা দুটি হল এবং শিক্ষার্থী পরিবহনে পর্যাপ্ত নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রত্যেক বিভাগের প্রয়োজনীয় ল্যাব, প্রায় ১২ হাজার গ্রন্থসমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, রোবটিকস ক্লাব, ডিবেটিং ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, প্রোগ্রামিং ক্লাব, স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, কালচারাল ক্লাব, লিটারেচার ক্লাব, স্পোর্টিং ক্লাব ইত্যাদি।
পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিটিউট ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ফ্লিন্ট, দি গ্লোবাল হেলথ অ্যাকাডেমিক, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়ংডং ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল ক্যাম্পাস, ভারতের বেঙ্গালুরভিত্তিক আচারিয়া ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স এবং আয়ারল্যান্ডভিত্তিক আসেম এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ হাব ফর লাইফ লং লার্নিং।
এ ইউনিভার্সিটিতে বর্তমানে বিভিন্ন প্রোগ্রামে পড়াশোনা করছেন দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সঙ্গে তাদের কোর্স সম্পন্ন করেছেন। কোর্স সমাপ্তকারীদের অধিকাংশ সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। অনেকে আবার উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দক্ষ শিক্ষকরাও উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাচ্ছেন।
নতুন শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের জন্য পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি গবেষণা এবং বৃত্তিকে উৎসাহিত করে। এখানে জ্ঞানের সকল শাখায় শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে একীভূত করে শেখার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা হয়। সহ-পাঠ্যক্রমিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উৎসাহিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে অভিজ্ঞ ও যোগ্য পূর্ণকালীন ফ্যাকাল্টি মেম্বার। মানসম্মত উন্নত পাঠদানের জন্য এখানে প্রথিতযশা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি মেম্বারও নিয়োগ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ইংরেজি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং কম্পিউটার দক্ষতা উন্নয়ন প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটালাইজড গ্রন্থাগারসহ সমৃদ্ধ বই এবং জার্নালে রয়েছে শিক্ষার্থীদের অনলাইন অ্যাক্সেস। ই-লার্নিং রিসোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শেখার অসুবিধা দূর করার জন্য আনুষ্ঠানিক পরামর্শ/টিউটোরিয়াল সেশন এবং মেক-আপ ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এখানে স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার গাইডেন্স এবং প্লেসমেন্ট পরিসেবা বিদ্যমান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও সুসজ্জিত ল্যাবরেটরিসহ আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে। ইইই এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ব্যবহারিক শিক্ষা ফলপ্রসূ করতে আমাদের আছে অত্যন্ত মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি। ক্যাম্পাসে রয়েছে ফ্রি ওয়াইফাই সুবিধা। এ ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মানসম্পন্ন দৃষ্টিনন্দন ক্যাফেটেরিয়া। পুণ্ড্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ক্রেডিট ট্রান্সফার সুবিধা রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো অত্যন্ত আধুনিক শিক্ষা উপকরণ মাল্টিমিডিয়া সমৃদ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথ মর্যাদায় শহীদ মিনারে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হয়। খেলাধুলার জন্য সেখানে রয়েছে বিশাল মাঠ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কো-কারিকুলার কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ফেস্ট, ডিবেট, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান প্রদর্শনী ইত্যাদি আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দেশের উত্তর জনপদে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে দক্ষ মানব সম্পদে উন্নীত করার লক্ষ্যে পিইউবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. হোসনে আরা বেগম, অশোকা ফেলো, পিএইচএফ অ্যান্ড একেএস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উন্নয়ন, টেকসই মানসম্পন্ন শিক্ষাপদ্ধতি, ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক এবং মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ সার্বিক উদ্যোগ প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে তুলছে।
উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রেখে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে নিচের আর্থিক সুবিধাগুলো দেওয়া হয়Ñ সেমিস্টারভিত্তিক ভর্তি ফি থেকে বিশেষ ছাড়; এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল বিবেচনায় সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ টিউশন ফি ছাড়; প্রত্যন্ত অনুন্নত অঞ্চলের মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও অন্যান্য ফি ছাড়াই পড়ার সুযোগ; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী কোটা এবং গরিব অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের টিউশন ফিতে ১০০% ওয়েভার দেওয়া; বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একই পরিবারের একাধিক শিক্ষার্থী (ভাইবোন/স্বামী-স্ত্রী) থাকলে যেকোনো একজনের টিউশন ফি থেকে ৮০ শতাংশ ছাড়, জাতীয় পর্যায়ের সার্টিফিকেটধারী খেলোয়াড়দের ১০০ শতাংশ টিউশন ফি ওয়েভারে উচ্চশিক্ষার সুযোগ; প্রতিবন্ধী ও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ ছাড়ে অধ্যয়নের সুযোগ; সেমিস্টারভিত্তিক ফালাফল বিবেচনায় বিশেষ ওয়েভার প্রদান এবং মাস্টার্স প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট ছাড় প্রদান।
পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সারা দেশের, বিশেষত অবহেলিত উত্তর জনপদের সব শ্রেণি-পেশার জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মানববিদ্যা, ব্যবসায় প্রশাসন শিক্ষাসহ আধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলে দিয়েছে।