প্রাথমিক বিদ্যালয়
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১০ পিএম
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সংকট দিন দিন বাড়ছে। বিশেষত গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ভয়ানক শিক্ষক সংকটে ভুগছে। কোথাও কোথাও একজন শিক্ষককেই একসঙ্গে বেশ কয়েকটি শ্রেণির পাঠ নিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে দপ্তরি, আয়া এবং নৈশপ্রহরীর সংকট। এ কারণে স্কুলগুলোতে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সংকট। এরই মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ১ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য নেওয়া হয়েছে ‘আইকিউ টেস্ট’ প্রকল্প, যা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও নাগরিকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পরিচালিত বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয়শুমারির (এপিএসসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের অনুযায়ী, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৬৫ হাজার ৪৫৭টি। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ১০৬টি পদ শূন্য। এ ছাড়া সারা দেশে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদসংখ্যা ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫৩টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ২৪ হাজার ৫৩৬টি। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলোর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৫টিতে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জনবল সংকটে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এই জনবল সংকট শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, তারা দুজন শিক্ষক মিলে ছয়টি শ্রেণি সামলিয়ে আসছেন। একসঙ্গে তিন শ্রেণির পাঠ দিতে হয়। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের কিইবা শেখানো যায়! তাদের স্কুলে দপ্তরি নেই, আয়া নেই, এমনকি নৈশপ্রহরীও নেই। ফলে চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে সরকারের দেওয়া ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে না।
অব্যবহৃত অবস্থায় আধুনিক ডিভাইস
শিক্ষকরা যাতে আধুনিক পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন, সেজন্য কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, ল্যাপটপ ও ট্যাব সরবরাহ করা হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, রংপুর, ঝিনাইদহ, খুলনা নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রাথমিক স্কুলগুলোতে এসব ডিভাইস ব্যবহার করা হচ্ছে না। ডিভাইসগুলো প্রধান শিক্ষকদের বাসায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ প্রসঙ্গে খুলনা জেলার একটি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্কুলে দপ্তরি বা নৈশপ্রহরী নেই। নিরাপত্তা না থাকায় রাতে প্রজেক্টর বা ল্যাপটপ স্কুলে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাধ্য হয়ে বাসায় রাখতে হয়। বছরের পর বছর ধরে এ ধরনের অনেক সমস্যা চলছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) সম্প্রতি এমন প্রকল্প নিয়েছে, যা মৌলিক সংকট নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখবে না।
কোটি টাকার ‘আইকিউ টেস্ট’ প্রকল্প
দেশের প্রায় ১ কোটি ১ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর জন্য ‘আইকিউ (বুদ্ধিমত্তা) টেস্ট’ গবেষণা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে ৬ থেকে ৮০ বছর বয়সি শিক্ষার্থী ও প্রাপ্তবয়স্কদের বুদ্ধিমত্তার স্তর যাচাই করা হবে। উল্লেখ্য, ৬-১২ বছর বয়সি শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ভুক্ত হলেও এ গবেষণার আওতায় ৬ বছর থেকে ৮৫ বছর বয়সিদের বুদ্ধিমত্তাও পরীক্ষা করা হবে। যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মিলছে না।
চলতি বছরের শুরুতে আইকিউ লেভেল পরীক্ষার জন্য দেশীয় উপযোগী নিরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে গঠন করা হয় আট সদস্যের কমিটি। কমিটিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (বিদ্যালয়) সভাপতি ও উপসচিব (বিদ্যালয়-২)কে সদস্য সচিব করা হয়। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে আছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পিইডিপি-৪), স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন প্রতিনিধি, সমাজকল্যাণ বিভাগের একজন প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য অধিপ্তরের একজন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও নেপের একজন প্রতিনিধি।
তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষার পরিবেশই যেখানে টেকসই নয়, যেখানে শিক্ষক নেই সেখানে আইকিউ প্রকল্প অর্থবহ হবে না; যা এক ধরনের নীতিগত বিচ্যুতি।
সূত্র জানাচ্ছে, এই গবেষণার টেকনিক্যাল কমিটির তালিকায় রয়েছে ৯৩ জন সদস্য, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয়ের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও অবাস্তব। এত বড় কমিটির কোনো কার্যপরিধি (টর) ঠিক করা হয়নি। রিপোর্টে উপজেলা ও অংশগ্রহণকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলক নমুনা ও সর্বাধিক ভিন্ন নমুনায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আইকিউ টেস্টে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো গাণিতিক পদ্ধতিগত ব্যাখ্যাও দেওয়া হচ্ছে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রাথমিকের মূল উদ্দেশ্য, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা কিংবা পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। অথচ আইকিউ নিরূপণের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নের পরিবর্তে দৃশ্যমান প্রচার চালানো হচ্ছে।’
ক্রয়ে ‘সিঙ্গেল সোর্স পদ্ধতি’, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের প্রকল্পের অনেকগুলোতেই সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে ‘সিঙ্গেল সোর্স ক্রয় পদ্ধতি’ নিয়মিতভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটিতে রয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা উপদেষ্টার এপিএস আবিদ সরকার সোহাগ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক স্বাক্ষর শতাব্দ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার একাধিক প্রকল্পে এক বা দুই ব্যক্তির ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা স্বাভাবিক নয়। এতে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় অর্থ ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নের অর্থ প্রযুক্তি নয়, বরং প্রশিক্ষিত শিক্ষক, উপযুক্ত পাঠ্যক্রম ও শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করা। আইকিউ টেস্টের মতো গবেষণার আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের ঘাটতি পূরণ, স্কুলে মৌলিক অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ তৈরিতে কাজ করা।
ব্যয়বহুল গবেষণার ফল কোথায়
গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় একাধিক ‘গবেষণাধর্মী প্রকল্প’ হয়েছে। কিন্তু এর প্রভাব মাঠপর্যায়ে অনুপস্থিত। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও ব্যক্তিদের কার্যকারিতা যাচাইয়ের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। তাই ব্যয় হলেও ফল মেলে না।
শিক্ষানীতি বিশ্লেষক ও গবেষক মেহরাব হোসেন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বর্তমানে যে ‘পরিকল্পনার বুদবুদ’ তৈরি হয়েছে, তা মূলত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সংযোগ নেই। প্রাথমিক শিক্ষার মূল সংকট- শিক্ষক কম, ভবন জরাজীর্ণ, নিরাপত্তাহীনতা, আর শেখার দুর্বল পরিবেশ। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন।’
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেনের মতে, ‘একটি শিশুর বিদ্যালয়ে যখন শিক্ষক নেই, পাঠদান হয় না, তখন তার বুদ্ধিমত্তা যাচাই মূল্যহীন। বরং এসব উদ্যোগ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার শামিল। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে এখনই শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। না হলে কোটি টাকার গবেষণা ও ভিডিও প্রচার কেবল নতুন বিতর্কই তৈরি করবে।’