বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
ফারুক আহমাদ আরিফ ও হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২৭ পিএম
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ১৪:২৯ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয় বলতে চোখে ভেসে ওঠে বিশাল ক্যাম্পাস, বড় বড় একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, বিশাল খেলার মাঠসহ আরও সুযোগ-সুবিধার উন্মুক্ত জায়গা। যেখানে ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা খেলতে পারেন, ঘুরতে পারেন, বসতে পারেন এবং অনায়াসে খোলা হাওয়ায় সহপাঠীদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। কিন্তু দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের এমন শর্ত না থাকলেও অবকাঠামোগত যে শর্ত দেওয়া আছে, তা ঢাকা জেলায় অবস্থিত ৫৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটা বাদে অধিকাংশেরই নেই। বেশিরভাগই চলছে ভাড়া করা বিল্ডিংয়ে। শুধু ক্লাস করার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ এসব বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষাবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শুধু পর্যাপ্ত ক্লাসের জায়গা থাকা নয়; ক্যাম্পাসজুড়ে উন্মুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। অনেক খোলামেলা জায়গা প্রয়োজন। যেন শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে খোলা মাঠে নামতে পারেন; চলতে পারেন। এ ছাড়া পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, লাইব্রেরি, ক্যাম্পাসে গ্রুপ স্টাডির জন্য পর্যাপ্ত নিরিবিলি উন্মুক্ত জায়গাও দরকার। তা না হলে শিক্ষার্থীদের পূর্ণ বিকাশ হবে না। শুধু রাজধানী নয়; আমাদের দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অবস্থা বা অবকাঠামোগত জায়গা নেই। এটা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য খুব ভালো কিছু হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. নুরে আলম সিদ্দিকী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শুধু বড় বড় বিল্ডিং নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার জন্য খোলামেলা জায়গা প্রয়োজন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেসব দেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে শহর গড়ে ওঠে। আমাদের দেশে শহরে বিশ্ববিদ্যালয় হয়; যেখানে জায়গা স্বল্পতা আছে। এ ছাড়া আমাদের দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কম। যারা বিনিয়োগ করছেন, তারা অল্প বিনিয়োগে বেশি কিছু করতে চান। যে কারণে আমাদের দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত সমস্যা বেশি। তবু কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করছে। এক্ষেত্রে ইউজিসির কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুব্যবস্থা নেই, সেগুলোকে বাছাই করে আরও তদারকির আওতায আনতে হবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জেনারেলাইজ করার সুযোগ নেই; কিছু ঘাটতি আছে। ২০১০ সালের নিয়ম অনুযায়ী, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ঘাটতি আছে; তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। অনেকে আমাদের নির্দেশনাগুলো নিয়ে কাজ করছেন। আশা করছি, শুধু অবকাঠামোগত জায়গা নয়; অন্যান্য জায়গারও সামনে আরও উন্নতি হবে।
তিনি আরও বলেন, এটা আসলে চলমান। অবস্থার কতটা উন্নতি হলো, সেটা দেখতে যাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে যেগুলোর ভালো হচ্ছে, সেগুলোর প্রশংসা করছি। যেগুলোর ঘাটতি থাকছে, সেগুলো নিয়ে নতুন করে দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। কতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত ঘাটতি আছে- এ প্রসঙ্গে বলেন, আনফরচুনেটলি; আমাদের এগুলোর নিয়ে সে রকম কোনো স্টাডি নেই। এখন নতুন করে তালিকা তৈরি করছি। আমি এটুকু বলতে পারি যে, ২০২৪-এ আসার পর থেকে এ পর্যন্ত কাজ করছি। শুধু অবকাঠামোগত জায়গা থেকে নয়; অন্যান্য জায়গাও সেগুলোর কিছু ঘাটতি আছে। আমরা কাজ করছি।
প্রসঙ্গত, দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ১৯৯২ সাল থেকে। ইউজিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু ঢাকা জেলায়ই রয়েছে ৫৭টি। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে তিনটি, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গাজীপুরে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
উল্লেখ্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী, প্রাইভটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য ১ একর ও অন্য এলাকার ক্ষেত্রে ২ একর জমি থাকার বাধ্যবাধকতা ছিল। নতুন করে সংশোধিত আইনে যেকোনো এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্থাপনের ক্ষেত্রে ৫ একর নিষ্কণ্টক জমি থাকার কথা বলা হয়েছে। আর প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২৫ হাজার বর্গফুট ভবন যথেষ্ট হলেও সংশোধিত খসড়ায় তা বাড়িয়ে এক লাখ বর্গফুট করা হয়েছে। একই সঙ্গে জমির পরিমাণ বাড়িয়ে পাঁচ একর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের আগে অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এ শর্ত শিথিল থাকবে।
এদিকে বর্তমানে দেশের শিক্ষাকার্যক্রম চলমান ৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬টির নেই স্থায়ী ক্যাম্পাস। এর মধ্যে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি অধিগ্রহণও হয়নি। যেগুলোর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের এই ধীরগতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিশ্চিত হচ্ছে না মানসম্মত শিক্ষা। আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, লাইব্রেরিসহ অনেক সুযোগ-সুবিধার সংকটে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
ইউজিসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মেরিটাইম-বিষয়ক উচ্চতর পড়াশোনার জন্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম ‘বিশেষায়িত’ বিশ্ববিদ্যালয় মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, এভিয়েশন-সংক্রান্ত বাংলাদেশের একমাত্র ‘বিশেষায়িত’ বিশ্ববিদ্যালয় এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই ক্যাম্পাস। এর বাইরে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব জমিতে সীমিত পরিসরে ছোট ভবন নির্মাণ করে আপাতত চালাচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম। তবে তা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়।