বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
ফারুক আহমাদ আরিফ ও হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৫ এএম
দেশে বন্যার পানির মতো হু হু করে বাড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। গত ১০ বছরে এ সংখ্যা বেড়েছে ৩৪টি। সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়েনি। তা ছাড়া এ সময়ে অনুমোদন নেওয়া সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কার্যক্রম চালুই করতে পারেনি। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজনও অধ্যাপক নেই। গবেষণা খরায় ভুগছে উচ্চশিক্ষার এসব প্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কোন পর্যায়ে রয়েছে- এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তালিকা নেই। এতে করে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে গিয়ে পড়ছেন বিপাকে।
দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হয় ১৯৯২ সাল থেকে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৮০টিতে। ২০২৩ সালের বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পাঁচটি বেড়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫টিতে। ২০১৫ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পায়, ২০১৮ সাল নাগাদ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৩, ১৯ সালে ১০৫, ২০২০ সালে বাড়ে দুটি, ২০২১ সালে একটি, ২২ সালে দুটি ও ২৩ সালে চারটি বেড়ে ১১৪টিতে দাঁড়ায়। অনুমোদন পাওয়া সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ধরনের কার্যক্রম চালু করতে পারেনি।
কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চলছে ১১ থেকে ২০ জন শিক্ষক দিয়ে। নেই অধ্যাপক। সহযোগী, সহকারী ও প্রভাষক দিয়ে চলছে শিক্ষাকার্যক্রম। এসবের মধ্যে নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি খুলনার ১৪০ শিক্ষক থাকলেও নেই কোনো অধ্যাপক। খুলনা খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জন শিক্ষক থাকলেও একজনও অধ্যাপক নেই।
ইউজিসির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুধু ঢাকা জেলায়ই রয়েছে ৫৭টি। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে তিনটি, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, গাজীপুরে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। চট্টগ্রামে রয়েছে ১১টি, কুমিল্লায় চারটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনীতে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বরিশাল ও খুলনায় তিনটি করে, রাজশাহীতে চারটি, নাটোরে দুটি, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, বগুড়া, জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বর্তমানে এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। শিক্ষক রয়েছেন ১৭ হাজার ৪৭৯ জন। তাদের মধ্যে পূর্ণকালীন ১৩ হাজার ও খণ্ডকালী ৪ হাজার ৩১০ জন। তাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১ : ৩৬।
কী আছে আইনে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর ৩৫নং ধারায় শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অভ্যন্তরীণ গুণগত মান নিশ্চিতকরণ সেল বা ইউনিট থাকবে এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থাদি সম্পর্কে একটি বিবরণী থাকতে হবে।
সেটির ৩ ও ৪ নম্বর উপধারায় শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ বা প্রোগ্রামের খণ্ডকালীন শিক্ষক-সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কোর্সের পূর্ণকালীন শিক্ষক-সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না।
মুনাফাধর্মী প্রতিষ্ঠানের দিকে মনোযোগ দেওয়ায় অধ্যাপক কম
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাকসহ হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেশিরভাগগুলোতেই শিক্ষার মান উন্নত নয়। তাদের অধ্যাপক সংখ্যা তথা প্রবীণ শিক্ষক কম। প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক দিয়ে চালানো হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রম। সেবাধর্মী থেকে মুনাফাধর্মী প্রতিষ্ঠানের দিকে মনোযোগ বেশি দেওয়ায় অধ্যাপক বা সহকারী অধ্যাপকের সংখ্যা কম। কেননা অধ্যাপক নিয়োগ দিলে তাদের বেতন-ভাতা বেশি দিতে হবে। কোনো ধরনের গবেষণা কার্যক্রম নেই। এক্ষেত্রে ইউজিসির সেখানে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষণাহীন শুধু শিক্ষায় ভালো হলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক শিক্ষাটা পাবেন। হাতে-কলমে শিক্ষা থেকে তা পিছিয়ে পড়ছে। এতে দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট হয়ে আসতে পারছেন না। এক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের পরামর্শ দেওয়া দরকার।
শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফিরে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
শিক্ষার্থীদের মাঠে বা রাস্তায় আর সময় অতিবাহিত না করে বরং ক্লাস ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মূল কাজ হচ্ছে পড়াশোনা করা। তারা তা না করে বরং অন্যান্য রাজনৈতিক কাজে বেশি সময় দিচ্ছেন। এতে শিক্ষার্থীদের অকল্পনীয় ক্ষতি হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) থেকে বিষয় ভিত্তিক অ্যাক্রেডিটেশন দিয়ে থাকি। এখন পর্যন্ত ৪০০ শতাধিক বিষয়ে আবেদন জমা পড়েছে। সেখানে পাঁচ-ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫টি বিষয়ে সনদ দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখতা। তারা পড়াশোনা ছাড়া বাকি সব কাজ করছেন। এতে আমাদের ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
তিনি বলেন, পড়ালেখা একটি সাধনার বিষয়। এখানে অল্প সময়ে সবকিছু পেয়ে যাবেন এমনটি সম্ভব নয়। তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমাদের অভিভাবকদের অবশ্যই এ বিষয়ে খোঁজ রাখতে হবে। তা ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের, সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ দরকার।
এদিকে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও র্যাঙ্কিং কত- এ সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। এ ব্যাপারে ইউজিসির এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, আমরা বলতে পারছি না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন। তাদের কারিকুলামের অবস্থান কী? কেননা, এ বিষয়টি মনিটরিং করা হয় না। আমাদের লোকবল কম। এতে কম লোক দিয়ে এতগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তদারকি করাও কঠিন।