ফারুক আহমাদ আরিফ ও হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:০৬ পিএম
টিউশন ফি নির্ধারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন মানলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামাফিক টিউশন ফি নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের গলা কাটছে। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে টিউশন ফি নির্ধারণের কথা বলা থাকলেও সেটি পালন করা হয় না। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের খেয়ালখুশিমতো টিউশন ফি নির্ধারণ করে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) আরও ক্ষমতা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ২০১০ সালের আইনে চলে। সেখানে টিউশন ফি নির্ধারণে ইউজিসির পরামর্শ ও তা যেন যৌক্তিকভাবে নেওয়া হয় সে ব্যাপারে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এগুলো কোনো মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান না। আইনেই সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বলা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যৌক্তিকভাবে যত কম টাকার টিউশন ফি নেওয়া যায় সেটিই উত্তম। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে। আর এখান থেকে কর্তৃপক্ষ টাকা নিয়ে যাবে সেটি হবে না।
কী বলছেন শিক্ষার্থীরা
রাজধানী ঢাকার বনানীতে অবস্থিত একটি মধ্যম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে পড়ালেখা করেন নোয়াখালী জেলার মো. মঈন উদ্দীন। তার বাবা ও বড় ভাই গ্রামীণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। এক ভাই থাকেন সৌদি আরবে। সবার আয়ে টেনেটুনে চলে তাদের সংসার। তারপরও বড় স্বপ্ন নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্নটি বড় হলেও তাকে প্রতিনিয়ত অর্থনীতির চাপ সামলাতে হচ্ছে। সেমিস্টারের টাকা সংগ্রহের জন্য বাড়িতে তাগাদা দিতে হচ্ছে ও টিউশনি করতে হচ্ছে। কোনো সেমিস্টারে টাকা জমা দিতে না পারলে তাকে বসতে দেওয়া হয় না পরীক্ষার হলে।
মঈন উদ্দীন গত বৃহস্পতিবার বলেন, আমাকে প্রতি সেমিস্টারে ৫৬ হাজার টাকা টিউশন ফি দিতে হয়। আছে অ্যাসাইনমেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যয়। তিনি জানান, তার বাসা ভাড়া থাকা-খাওয়া বাবদ ১১-১২ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ ৬ মাসের সেমিস্টারে থাকা-খাওয়া ও টিউশন ফিসহ ১ লাখ ২৮ হাজার ও বছরে ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করতে হয়।
রাজধানীর একটি প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনোমিক্স ডিপার্টমেন্টে পড়ালেখা করেন রংপুরের মামুন রহমান। তিনি জানান, ডিপার্টমেন্টটিতে ভর্তি হওয়ার সময় তার পার ক্রেডিট ছিল ৪ হাজার টাকা। গত ৪ বছরে তা বেড়ে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, তখন এক সেমিস্টারে খরচ হতো তা ৫০-৫৫ হাজার টাকা। বর্তমানে তা ৭০ হাজার টাকার বেশি। বছরে তিনটি সেমিস্টারে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তার প্রতি মাসে ১৩ হাজার টাকা করে থাকা-খাওয়াসহ বছরে দেড় লাখ টাকা ব্যয় হয়। সে হিসাবে বছরে তাকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়।
তিনি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গলা কাটার মতো টিউশন ফি নেয়। এখানে দেখার কেউ নেই, প্রশ্ন করতে পারেন আমরা কেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম? জবাব হচ্ছে এ ছাড়া হাতে কি আর বিকল্প ছিল?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের উৎস
দেশে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ২০১০ সালে এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে আইন করা হয়। সেই আইনের ৪১ নম্বর ধারায় অর্থায়নের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
সেখানে ৬টি উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ১. কোনো জনকল্যাণকামী ব্যক্তি, ব্যক্তিগোষ্ঠী, দাতব্য ট্রাস্ট বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিঃশর্তভাবে প্রদত্ত দান; ২. কোনো জনকল্যাণকামী ব্যক্তি, ব্যক্তিগোষ্ঠী, দাতব্য ট্রাস্ট, প্রতিষ্ঠান বা সরকার হইতে প্রাপ্ত ঋণ ৩. কোনো জনকল্যাণকামী ব্যক্তি, ব্যক্তিগোষ্ঠী, দাতব্য ট্রাস্ট বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান; ৪ শিক্ষার্থী ফি; ৫. বিভিন্ন খাতে সৃষ্ট সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় এবং ৬. সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য উৎস।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি বাবদ কী পরিমাণ অর্থ নেওয়া যাবে সে সম্পর্কে ৪২ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে- প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মানদণ্ডে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শিক্ষার্থী ফি কাঠামো প্রস্তুত করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে (ইউজিসি) অবহিত করবে। কমিশন অবহিত হওয়ার পর প্রয়োজনে পরামর্শ প্রদান করবে।
তা ছাড়া ৪৪ নম্বর ধারায় ‘সাধারণ তহবিল’ সম্পর্কে বলা হয়েছে- ১ সংরক্ষিত তহবিল ছাড়াও, প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ তহবিল থাকবে। প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সেই সাধারণ তহবিলে শিক্ষার্থীদের নিকট হতে সংগৃহীত বেতন, ফি ও অন্যান্য উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ জমা করে তা ব্যয় করবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চ হারে টিউশন ফি নিচ্ছে এসব কমানো সম্ভব কি না জানতে চাইলে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইকোনমিক ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক একে এনামুল হক বলেন, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে এক মাপে ধরা যাবে না। কেননা এখন ঢাকায় অনেক স্কুল আছে যাদের টিউশন ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি। তা ছাড়া পর্যাপ্ত অর্থ না দিলে ভালো মানের শিক্ষক পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যয়ও অনেক। এসব প্রতিষ্ঠান জমি কেনা, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। শিক্ষকদের উচ্চ মানের বেতন-ভাতা দেয়। ফলে খরচ অনেক হয়ে যায়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ৬টি উৎস থেকে অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এখানে শুধু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া টিউশন ফি’র ওপরই কেন নির্ভর করছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ছাড়া আর তো কোনো উৎস নেই। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো টাকা পায় না। আর বিদেশ থেকে কোনো অনুদানও আনতে পারে না। সেক্ষেত্রে তারা শুধু ছাত্রদের টিউশন ফি’র ওপরই নির্ভর করে থাকে।
টিউশন ফি কীভাবে কমানো যায়
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের জন্য গত ২০১৭ সাল থেকে সভা-সমাবেশ, সেমিনার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের লিখিত সংশোধনীসহ বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া পেশ করে আসছে মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস। সংগঠনটির যুগ্ম-আহ্বায়ক এনায়েত উল্লাহ শরীফ (কৌশিক) বলেন, আমরা গত বছর ইউজিসির চেয়ারম্যান বরাবর লিখিতভাবে জানিয়েছি, ৬টি উৎস থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের সুযোগ রয়েছে। অথচ শুধু শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলো যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করে। এ অবস্থার পরিবর্তন করে সব উৎস থেকে অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়া সিজিপি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিউশন ফি কমাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে। তা ছাড়া টিউশন কয়েক কিস্তিতে যাতে দেওয়া যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, অনলাইন বা হাইব্রিড ক্লাস পরিচালনায় খরচ কম হয়, তাই এসব কোর্সে ফি কমানোর যুক্তি দেওয়া যেতে পারে। সাবেক শিক্ষার্থীদের দিয়ে একটি ডোনেশন ফান্ড গঠন করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মুনাফা করার কোনো সুযোগ নেই
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে টিউশন ফি নেয় তা নিজেরাই নির্ধারণ করে থাকে। সেখানে ইউজিসিকে তারা শুধু অবহিত করে এবং প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনে পরামর্শ প্রদান করতে পারে। কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না এটি সংশোধন প্রয়োজন কি না জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবেই উচ্চ হারে টিউশন ফি নিতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের পর্যাপ্ত অর্থ-প্রতিপত্তি দিয়েছে, তারা তা দিয়ে শিক্ষা খাতে অবদান রাখবে, এজন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে কোনোভাবেই মুনাফা করার জন্য প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নেবে। তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় মুনাফা করার কোনো সুযোগ নেই।