বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৩১ এএম
আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:৫৩ এএম
প্রবা ফটো
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোট চলছে। আজ সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে; যা চলবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গতকাল বুধবারই সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন তারা।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে ২৩টি পদের বিপরীতে ২৪৭ জন, সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে ৫ পদে ৫৮ জন এবং ১৭টি আবাসিক হল সংসদ নির্বাচনে প্রতি হলে ১৫ পদের বিপরীতে ৫৯৭ জন লড়াই করবেন। মোট ২৮ হাজার ৯০১ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি ভবনের ১৭টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব কেন্দ্রের ৯৯০টি বুথে ভোটাররা ভোট দিবেন।
নির্বাচনে ১১টি প্যানেল মাঠে নেমেছে। এর মধ্যে ৬টি প্যানেল আলোচনায় রয়েছে। প্যানেলগুলো হলো- ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’, ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’, বামপন্থিদের ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশনের ‘রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ’, সাবেক সমন্বয়দের ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ ও ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’।
সাত পদে হড্ডাহাড্ডি লড়াই
রাকসুর সাত পদে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা। এই পদগুলোতে যাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাঁদের অনেকেই ক্যাম্পাসে আলোচিত ও পরিচিত মুখ। ফলে লড়াইয়ে নির্বাচনে কারোর থেকে কাউকে পিছিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে আলোচনায় এগিয়ে আছেন চারজন প্রার্থী। তারা হলেন ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের শেখ নূর উদ্দিন আবীর, ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, সাবেক সমন্বয়ক ও প্রথম নারী ভিপি প্রার্থী তাসিন খান, ছাত্র অধিকার পরিষদ সমর্থিত প্রার্থী মেহেদী মারুফ।
সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে এগিয়ে থাকা ৩ প্রার্থী হলেন ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থী নাফিউল জীবন, ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী ফাহিম রেজা, সাবেক সমন্বয়ক সালাউদ্দিন আম্মার। সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে এগিয়ে থাকা পাঁচজন হলেন ছাত্রদলের প্যানেলের জাহিন বিশ্বাস এষা, শিবিরের প্যানেলের সালমান সাব্বির, জুলাইয়ের সম্মুখসারীর যোদ্ধা শাহ পরাণ, সাবেক সমন্বয়ক মাহায়ের ইসলাম, ছাত্র অধিকার পরিষদের আল শাহরিয়ার শুভ।
ক্রীড়া ও খেলাধুলা সম্পাদক পদে চারজনের মধ্যে লড়াই হবে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁরা হলেন- ছাত্রদল সমর্থিত মোছা. নার্গিস খাতুন, সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের শীত কুমার উরাং, ছাত্রশিবির সমর্থিত মো. হামিদুল্লাহ নাঈম ও সাবেক তিন সমন্বয়কের প্যানেলের মো. ইয়াসিন আরাফাত বিজয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে লড়াই হতে পারে তিনজনের মধ্যে। তাঁরা হলেন- স্বতন্ত্র প্রার্থী ও গানের দলের পরিচালক কাজী শফিউল কালাম (কে এস কে হৃদয়), ছাত্রশিবিরের জায়িদ হাসান জোহা ও ছাত্রদলের মো. আবদুল্লাহ আল কাফী। বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদের গোপাল রায়, ছাত্রশিবিরের ইমরান মিয়া লস্কর, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মামুনুজ্জামান স্নিগ্ধ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল ইসলাম সন্ধি। এছাড়া ৫৫ জন নির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ১৩ জন প্রার্থী আলোচনায় আছেন। এই পদের প্রার্থীদের মধ্যেও ভালো লড়াই হবে।
কারচুপি ঠেকাতে ‘থ্রি ডাইমেনশনাল সিকিউরিটি’
নির্বাচনে ভোট কারচুপি ঠেকাতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বুধবার নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ জানিয়েছেন, ‘ভোটে ভোটারদের জন্য বিশেষ অমোচনীয় কালি ব্যবহার হবে। কারচুপি ঠেকাতে আমরা শুধুমাত্র অমোচনীয় কালির উপরে নির্ভর করছি না। তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। প্রথমত শিক্ষার্থী আইডির কার্ডের সত্যতা যাচাই করা হবে। দ্বিতীয়ত, ভোটারের আইডির জন্য একটি ইউনিক আইডি দেওয়া হয়েছে, সেটি যাচাই করা হবে। সবশেষে ভোটারের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা থেকে নিশ্চিত করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের সন্দেহ তৈরি হলে একটি বিশেষ গোপনীয় কিউআর কোড থাকবে। ফলে আমরা এটাকে নাম দিয়েছি ‘থ্রি ডাইমেনশনাল সিকিউরিটি’। প্রতিটি ধাপে ফুলপ্রুফ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটাকে অগ্রাহ্য করে কোন অবস্থাতেই কোন ধরনের ভোটের জালিয়াতি করার কোন সুযোগ আমরা রাখিনি।’
ফলাফল প্রস্ততে ৪৩ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি
ভোটের ফলাফল প্রস্ততে ৪৩ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ‘আমরা ডাকসু ও জাকসুর তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েছি। রাকসুতে আমরা সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থেকেছি। নির্বাচনের ফলাফল প্রস্তত করতে আমরা বিশেষজ্ঞ কমিটি করেছি। তাড়াহুড়া করে ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য কোন ফলাফল আমরা প্রকাশ করবো না। আমরা ইতিমধ্যে যে ৪৩ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বনামধন্য অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি কমিটি করেছি।’
১৭ ঘণ্টায় ফলাফল প্রকাশের চেষ্টা
১৭ ঘণ্টার ভেতরে ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে। কনিশন জানায়, ‘কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সকল কেন্দ্র থেকে আমরা ব্যবহৃত ব্যালটবাক্স সিলগালা করে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে আমরা কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তানে নিয়ে আসা হবে। সেখানেই ১৭ টি হলের ফলাফল ধারাবাহিকভাবে তৈরী করা হবে। ওএমআর মেশিনে এটি রিড করে যথাসম্ভব দ্রুত তার সাথে ফলাফল প্রকাশের চেষ্টা করা হবে। মেশিনের সক্ষমতা অনুযায়ী আমরা আশা করছি সর্বোচ্চ ১৭ ঘন্টার ভেতর ফল প্রকাশ করতে পারব।’
নিরাপত্তায় পুলিশ-বিজিবি-র্যাব
নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটার, প্রার্থী এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে দুই হাজার পুলিশ সদস্য, ১২ প্লাটুন র্যাব ও ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়ন করা হয়েছে।’
নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলা অবনতির কোনো আশঙ্কা নেই বলে রাজশাহী মেট্রো পলিটন পুলিশ কমিশনার আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। যে জায়গাগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে সেগুলো পর্যালোচনা করে ইতিমধ্যে আমরা নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। আমরা নির্বাচন ঘিরে তিন ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আমাদের আলাদা সাইবার টিম কাজ করছে। যেকোনো অপপ্রচার বা অপতথ্য ছড়ায় না ছড়ায় তো সেজন্য আমরা কাজ করছি। কোন ঘটনা আমাদের নজরে আসলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ১০ সদস্যের কমিটি
নির্বাচনের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দশ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার জন্য এ কমিটি কাজ করবে। কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম।
কোন কেন্দ্রে কোন হল ভোট
বিশ্ববিদ্যালয়ের মমতাজউদ্দিন একাডেমিক ভবনে সমাজকর্ম বিভাগের ১৫৬ নম্বর কক্ষে ভোট দেবেন মন্নুজান হলের ভোটাররা, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী একাডেমিক ভবনে ভোট দেবেন দুইটি হলের ভোটাররা। এদের মধ্যে ভবনের উত্তর গেট দিয়ে প্রবেশ করে ১২৮ নম্বর কক্ষে জুলাই-৩৬ হল এবং দক্ষিণ-পূর্ব গেট ব্যবহার করে ১২২ নম্বর কক্ষে ভোট দেবেন বেগম রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা।
রবীন্দ্র ভবনে ভোট দেবেন তিনটি হলের ভোটাররা। পূর্ব-মধ্য গেট দিয়ে প্রবেশ করে ১৪৬ নম্বর কক্ষে তাপসী রাবেয়া হল, পূর্ব-দক্ষিণ ফটক দিয়ে প্রবেশ করে ১১৯ নম্বর কক্ষে বেগম খালেদা জিয়া হল এবং দক্ষিণ পশ্চিম ফটক ব্যবহার করে ১২৩ নম্বর কক্ষে রহমতুন্নেসা হলের শিক্ষার্থীরা ভোট প্রদান করবেন।
এদিকে জাবির ইবনে হাইয়ান বিজ্ঞান ভবনে ভোট দেবেন দুটি হলের ভোটাররা। ১৩৩ নম্বর কক্ষে শহীদ হবিবুর রহমান হল এবং ১০১ নম্বর কক্ষে শহীদ শামসুজ্জোহা হল। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ কলা ভবনে বাংলা বিভাগের ১৫০ নম্বর গ্যালারি কক্ষে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা।
জামাল নজরুল ইসলাম বিজ্ঞান ভবনের সিএসএলের ১২৫ নম্বর কক্ষে বিজয়-২৪ হল এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ফটক ব্যবহার করে ১১৬ নম্বর কক্ষে নবাব আব্দুল লতিফ হলের শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের ১৩৩ নম্বর কক্ষে শের-ই বাংলা ফজলুল হক হল এবং ২০৮ নম্বর কক্ষে মতিহার হল, জগদীশ চন্দ্র একাডেমিক ভবনের টিচার্স লাউঞ্জে মাদার বখশ হল এবং ১০৫ নম্বর কক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের ভোটাররা ভোট দেবেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনের পূর্ব হল রুমে সৈয়দ আমীর আলী হল এবং পশ্চিম হল রুমে শাহ মখদুম হলের ভোটগ্রহণ চলবে।
সার্বিক বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম বলেন, রাকসু নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে ফুলপ্রুফ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, সকল প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারগণ নির্বাচনের নিয়মাবলি মেনে চলবেন এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখবেন। আমি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সকলকে সহযোগিতার আহ্বান জানাচ্ছি।’