হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২১ এএম
ষড়ঋতুর দেশে ‘বর্ষা’ বিদায়ের পরেই প্রকৃতিতে সাদা মেঘের ভেলায় চড়ে আসে ‘শরৎ’। ভাদ্র আর আশ্বিনÑ দুমাসের এ ঋতুতে আকাশে সাদা মেঘের সঙ্গে মিতালি হয় কাশফুলের। মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় কাশবনের সঙ্গে দুলে ওঠে বাঙালির হৃদয় ও মন। শরতের শেষ মাস, আশ্বিনের ২৬তম দিনে শনিবার (১১ অক্টোবর) ছায়ানট এবং সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘শারোদোৎসব ১৪৩২’।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আসাদগেটের সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকন্ডারি স্কুলের বাস্কেটবল মাঠে মেঘ ও রোদের লুকোচুরির মাঝে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শরৎ প্রাতে অরুণ আলো’। শরতের বৃষ্টিস্নাত সকাল সাড়ে ৭টায় দুই পর্বের এ আয়োজনের শুরুতেই সম্মেলক কণ্ঠে ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ শীর্ষক গানটির সঙ্গে সম্মেলক নৃত্যে উৎসবস্থল মুখর করে তোলেন সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের কালচারাল ফোরামের শিক্ষার্থীরা। সম্মেলক এ নৃত্য-গীতের পরেই মঞ্চে একক কণ্ঠে গান পরিবেশন করেন শিশুশিল্পী বাঁধন কুন্ডু। তিনি গেয়ে শোনান রবীঠাকুরের ‘আমারে ডাক দিল কে’ শীর্ষক একটি গান। এরপরে একে একে মঞ্চে এসে আরও দুই খুদেশিল্পী দিব্যময় দেশ ও মির্জা তাবীব ওয়াসিত; গেয়ে শোনায় যথাক্রমে ‘শরতে আজ কোন অতিথি’ ও ‘শিউলি ফুল শিউলি ফুল’। এরপর বৃন্দ আবৃত্তিতে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শরৎ’ পরিবেশন করেন সেন্ট যোসেফের কালচারাল ফোরামের শিক্ষার্থীরা। সবশেষে ‘তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে’ শীর্ষক সম্মেলক কণ্ঠের গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য পরিবেশন করেন তারা।
স্কুল আর পড়াশোনার মধ্যে বন্দি থাকা দিনগুলো পেছনে ফেলে বিভিন্ন বয়সি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানা কাজে ব্যস্ত থাকা বিভিন্ন পেশার অভিভাবকরাও মেতে ওঠেন শরৎ বন্দনার নৃত্য, গান, নাটক আর কবিতা আবৃত্তি দিয়ে সাজানো আনন্দে-হিল্লোলে।
‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ দেওয়ার আয়োজন শেষে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে দেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন ছায়ানট নিবেদন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শারোদোৎসব’। গান, নাট্যাংশ পাঠ ও অভিনয়ে অংশ নেন নালন্দা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও সংগীত-প্রবেশ বিভাগের শিশু শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে ছিল শিল্পী মোস্তাফিজুর রহমান তূর্য এবং সত্যম কুমার দেবনাথের কণ্ঠে গান। শারোদোৎসবের নাট্যাংশের মাঝে মাঝে পরিবেশিত গানগুলো ছিলÑ ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি, ‘আজ ধানের ক্ষেতে’, ‘আনন্দেরই সাগর হতে’, ‘তোমার সোনার থালায়’, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ’ ও ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’। সবশেষে সম্মেলক নৃত্যগীত ‘নয়ন ভুলানো এলে’ পরিবেশনাটির নির্দেশনায় ছিলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বেলায়েত হোসেন খান। আর, শারোদোৎসবের আয়োজনে তবলায় সংগত করেনÑ সুবীর ঘোষ ও গৌতম সরকার, এস্রাজ-এ শৌণক দেবনাথ ঋক, বাঁশিতে মামুনুর রশিদ এবং কি-বোর্ডে রবিন্স চৌধুরী।
দুই পর্বের শরৎ বন্দনার এই আয়োজনে ছায়ানট এবং সেন্ট যোসেফের কালচারাল ফোরামের শিক্ষার্থীদের বর্ণিল ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় শারোদোৎসব উপভোগ করেন কয়েকশ শিক্ষক, শিল্পী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। আয়োজন নিয়ে ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা বলেন, ‘আমরা আরও বেশি মানুষের কাছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে যেতে চাই। সে লক্ষ্যেই সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের সঙ্গে প্রথমবার যৌথভাবে এই আয়োজন। সামনের দিনে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা এমন আয়োজন করতে চাই।’ সমাজে আলোক শিখা জ্বালিয়ে রাখতে হবে মন্তব্য করে লাইসা আহমদ লিসা আরও বলেন, ‘যারা অন্ধকারে আছে তাদের মাঝেও আলো জ্বালাতে হবে।’
ছাদঢাকা বাস্কেটবল মাঠে উৎসবের আয়োজন হলেও কাশফুল দিয়ে সাজানো হয় শারদোৎসবের মঞ্চ ও এর আশপাশ। বর্ণিল এই শরৎ উদযাপন প্রসঙ্গে নৃত্য শিক্ষক ও শিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এই আয়োজনে এসে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করছে। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন আয়োজন আরও বেশি বেশি হওয়া উচিত। তাহলে শিশুরা তাদের কচি মনে বৈচিত্র্যময় ঋতু ও প্রকৃতির বাংলাদেশের সৌন্দর্য অনুধাবন করতে শিখবে, ধারণ করতে শিখবে। পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর আমাদের যে নির্ভরতা, সেটা তারা শুরু থেকেই বুঝতে শিখবে।’
ছায়ানটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায় বলেন, ‘শরৎ হলো শীত এবং বর্ষার মেলবন্ধন। আমরা এবার সেন্ট যোসেফ স্কুলের সঙ্গে এ আয়োজন করেছি, তার কারণ নবীন যে শিক্ষার্থী তারাও ঋতুবৈচিত্র্যকে চিনতে শিখুক।’