রাকসু
প্রান্ত কুমার দাশ, রাবি
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
পূজার ছুটি শেষে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। সঙ্গে নতুন করে গতি পেয়েছে বহু প্রতীক্ষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। গতকাল রবিবার সকাল থেকেই প্রার্থীরা নেমে পড়েন ভোটের মাঠে, ছুটছেন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে। তবে এই নির্বাচনী উত্তেজনার মাঝেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অমীমাংসিত পোষ্য কোটা সংকট এবং শিক্ষকদের কর্মবিরতির চাপা আতঙ্ক। ফলে আগামী ১৬ অক্টোবরের নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের মেঘ এখনও কাটেনি।
ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান- একাডেমিক ভবন, টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন মার্কেট ও আবাসিক হলগুলোতে নির্বাচনী আমেজ ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটারদের কাছে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলসহ বিভিন্ন প্রার্থী লিফলেট বিতরণ করে নিজেদের ইশতেহার তুলে ধরেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব শিক্ষার্থী এখনও ক্যাম্পাসে না ফেরায় এবং বৈরী আবহাওয়া প্রচারণার পথে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও প্রার্থীদের কণ্ঠে ফুটে উঠছে শঙ্কার সুর। বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা বলছেন, নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে রয়েছে আলাদা উদ্দীপনা। তবে পোষ্য কোটা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় একটি অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে উল্লেখ করে ছাত্রশিবির মনোনীত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজা বলেন, ‘নির্বাচনের ঠিক আগে তারিখ পরিবর্তন ও পোষ্য কোটার বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় নির্বাচন নিয়ে এখনও শঙ্কা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা রাকসু চায়, এটা তাদের প্রাণের দাবি।’
ছাত্রদল মনোনীত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী নাফিউল জীবন বলেন, ‘অনেক বছর পরে রাকসু নির্বাচন হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে আলাদা এটা উদ্দীপনা কাজ করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
সার্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী সামসাদ জাহান বলেন, ‘রাকসু নিয়ে অনেক টালবাহানা চলছে। তবে এটা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীরা এটা আদায় করে নেবেই।’
এদিকে নানা দাবিদাওয়ার কারণে এ পর্যন্ত ছয়বার পরিবর্তিত হয়েছে তফসিল। ২৫ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণের কথা থাকলেও ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয়বারের মতো পিছিয়ে নতুন তারিখ ধরা হয় ১৬ অক্টোবর। তবে এবারও নির্ধারিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই শঙ্কার অন্যতম কারণ পোষ্য কোটা পুনর্বহালের দাবি। পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ধস্তাধস্তির ঘটনায় শিক্ষক লাঞ্চনার অভিযোগ এনে শিক্ষকদের কর্মবিরতি।
‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কর্মবিরতি- সেটি ৯ তারিখের পর আবারও ফিরবে কি না আমরা নিশ্চিত নই। আবার শিক্ষকদের যে দাবি শিক্ষার্থীদের বিচারের মুখোমুখি করা- সেটি তারা মেনে নেবে বলে আমাদের মনে হয় না। সব মিলিয়ে রাকসুতে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না তা নিয়ে একটা শঙ্কার জায়গা তো আছেই। তবে আমরা আশাবাদী।’
রাকসু ফর রেডিক্যাল চেঞ্জ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মেহেদী মারুফ বলেন, ‘রাকসুর আকাশে এখনও কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছি, আমরা আশা করব, সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং প্রশাসন এক্ষেত্রে যথাযথ দায়িত্বশীল আচরণ করবে।’
জানতে চাইলে পোষ্য কোটা বিষয়ক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আমরা রাকসু নির্বাচন চাই। সুষ্ঠু, স্বাভাবিক সুশৃঙ্খলভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে রাকসু নির্বাচন হোক। আমরা চেষ্টা করব, রাকসু নির্বাচন যেন বিঘ্নিত না হয়। কিন্তু প্রশাসনের আন্তরিকতা থাকতে হবে।’
আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমীরুল ইসলাম বলেন, ‘আন্দোলনের বিষয়টি নির্ভর করবে প্রশাসনের ওপর। আমরা দৃশ্যমান শাস্তি দেখতে চাই। যদি দৃশ্যমান কিছু না হয় তাহলে আমরা সিদ্ধান্ত জানাব। তবে রাকসু নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে না।’
এদিকে নির্বাচন কমিশন তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এফ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রাকসু নির্বাচন পেছানোর কারণে প্রচারণার সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত আচরণবিধি মেনে প্রচারণা চালাতে পারবে প্রার্থীরা। এছাড়া ১৬ অক্টোবর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষকদের দাবি অনুযায়ী একটি কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়াও বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্যও আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, পোলিং এজেন্ট নিয়োগসহ শিক্ষকদের ভেতর থেকে দায়িত্ব পালন করার মতো কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। শিক্ষকদের দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমে ভিন্নতা না থাকায় শিক্ষক-কর্মকর্তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। যেহেতু আগামী ১৬ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের একটি বড় ইভেন্ট রয়েছে, সেখানে তাদের আর কর্মসূচিতে আসার কোনো আশঙ্কা আমরা দেখছি না।’