প্রান্ত কুমার দাশ, রাবি
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২০:১০ পিএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:১৯ পিএম
নির্ধারিত সময় থেকে ২১ দিন পেছাল রাকসু নির্বাচন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে পিছিয়ে আগামী ১৬ অক্টোবর করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন পেছানোয় ছাত্রদলসহ বাকি সংগঠনগুলো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও বিক্ষোভ করেছে ছাত্রশিবির।
শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থা এবং ছাত্রদলসহ কয়েকটি প্যানেলের দাবির মুখে সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে এ সিদ্ধান্ত জানায় নির্বাচন কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভুত পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে সোমবার বিকেলে আলোচনা সভায় বসে নির্বাচন কমিশন। প্রায় ৩ঘন্টা বৈঠক শেষে এ নির্বাচনের দিন পেছানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘ বর্তমান পরিস্থিতিতে রাকসু নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়, তাই নির্বাচন কমিশন দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
সোমবার রাত পৌনে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি কোনো অবস্থাতেই রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুকূলে নয়।’
নির্বাচন পেছানোর কারণ হিসেবে বিজ্ঞপ্তিতে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলমান থাকায় নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিশ্চিত করা যায়নি। দ্বিতীয়ত, পোষ্য কোটা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন এবং আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটির কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাস ছাড়ার বিষয়টিকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ছাত্রদলসহ কয়েকটি প্যানেল এ বিষয়গুলো তুলে ধরে নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছিল।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘উপর্যুক্ত বিবেচনায় রাকসু নির্বাচন উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার স্বার্থে কমিশন আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের পরিবর্তে আগামী ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ বৃহস্পতিবার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।’
এর আগে সোমবার দুপুরে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রাকসু নির্বাচন পিছিয়ে দূর্গাপূজার পরে ভোটগ্রহণের দাবি জানান ছাত্রদল মনোনীত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দিন আবীর। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বাড়িতে চলে গেছেন, ভোটার নেই বললেই চলে। আমরা চাই, সর্বোচ্চ ভোটারের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নির্বাচন হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের চাওয়া, নির্বাচনটা দুর্গাপূজার ছুটির পরে হোক।’ পরে তারা নির্বাচন কমিশনে স্মারক লিপিও দেয়।
ছাত্রদল ছাড়াও আরও ৪টি প্যানেল নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার পরে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি জমা দেন। প্যানেলগুলো হলো—ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত ‘রাকসু ফর র্যাডিকাল চেঞ্জ’, তাসিন খানের নেতৃত্বাধীন ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন মনোনীত ‘সচেতন শিক্ষার্থী পরিষদ’।
এদিকে নির্ধারিত ২৫ সেপ্টেম্বরই নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি জানায় ইসলামী ছাত্রশিবির। সোমবার বিকেলে ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক রাকসু বানচালকারী গোষ্ঠী নির্বাচন পেছানোর অপরাজনীতি করছে। আমাদের মতামত হচ্ছে, যথাসময়েই নির্বাচন হতে হবে।
নির্বাচন পেছানোয় ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ ছাত্রদলসহ বাকিদের উচ্ছ্বাস
সোমবার বিকেলে নির্বাচন কমিশন রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে আলোচনায় বসলে বাইরে জড় হয় ‘গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ’, ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত ‘রাকসু ফর র্যাডিকাল চেঞ্জ’, তাসিন খানের নেতৃত্বাধীন ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। সন্ধ্যার দিকে ছাত্রদল এসেও যোগ দেয়।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা দুই পক্ষে মুখোমুখি অবস্থান হয়ে নির্বাচনের সময় পেছানো নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। রাতে নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা হলে শিক্ষার্থীদের একাংশ বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে।
এদিকে রাকসু নির্বাচন পেছানোর প্রতিবাদে কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে শাখা ইসলামি ছাত্রশিবির।
সিদ্ধান্ত আসতে দেরি হওয়ায় ২৫ সেপ্টেম্বরই নির্বাচনের দাবিতে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন।
অন্যদিকে ‘ভোটারবিহীন রাকসু চাই না’ দাবি করে বাম সংগঠন মনোনীত প্যানেলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পাল্টা স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এদিকে ৭টা ৫ মিনিটের দিকে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের সামনে বাম সংগঠন মনোনীত প্যানেলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় ছাত্রদল। এ সময় উভয় পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয়।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন পেছানোর কথা জানানো হয়।
এ খবর পেয়ে ছাত্রশিবির ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘২৫ তারিখেই রাকসু, দিতে হবে, দিতে হবে’, ‘সিন্ডিকেটের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ বলে বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যপক্ষ ‘ভুয়া, ভুয়া’ বলে উল্লাস শুরু করে।
এরপর তারা সেখান থেকে সরে গিয়ে রাকসু ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত বিক্ষোভ করে।
বিক্ষোভ সমাবেশে ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও রাকসু নির্বাচনের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আস্থার জায়গা হারিয়ে ফেলেছে। বারবার নির্বাচন পেছানোর যে অপরাজনীতি করছে, তা শিক্ষার্থীরা ৩৫ বছর থেকে দেখে দেখে বিরক্ত। আমরা ইসলামী ছাত্রশিবির ২৫ তারিখেই নির্বাচন চাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ বলেন, ‘ছাত্রশিবির একতরফাভাবে রাকসু নির্বাচন কীভাবে দখল করা যায়, সে ষড়যন্ত্র করছিল। ছাত্রদলসহ অন্য শিক্ষার্থীরা এই ষড়যন্ত্র রুখতে সক্ষম হয়েছি। আমরা মনে করি, এতে শিক্ষার্থীদের বিজয় হয়েছে।’
ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘তারা (ছাত্রশিবির) মানছে না, কিন্তু মানতে হবে। ক্যাম্পাসের এই অবস্থায় এখন কোনোভাবেই নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়।’
শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’
এদিকে পোষ্য কোটা ইস্যুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাতাহাতির ঘটনায় শিক্ষককে ‘লাঞ্ছনার’ অভিযোগ তুলে জড়িতদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে দিনভর কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ দাবিতে সোমবার সকাল থেকেই ক্লাস পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রম বর্জন করে প্রশাসন ভবনের পাশে অবস্থান নেন। বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে তারা বলেন,‘ ছাত্রনামক কতিপয় সন্ত্রাসী শিক্ষকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা করেছে। যে ঘটনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কখনও হয়েছে বলে মনে হয়না। শিক্ষকদের ওপর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হামলা হয়েছে। এই ন্যাক্কারজনক হামলায় জরিত ছাত্র নামক সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যতদিন শাস্তি দৃশ্যমান না হবে আন্দোলন চলবে।’