সাক্ষাৎকার অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:০৬ পিএম
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৭:০৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ৭০ শতাংশ উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে সংস্কার হলে দেশের ৭০ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে। সেজন্য প্রয়োজন আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত সিলেবাস এবং কারিকুলাম। এই সিলেবাস তৈরিতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস দরকার বলে জানিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম আমানুল্লাহ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিবেদক ফারুক আহমাদ আরিফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-
প্রবা : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শিক্ষা খাতে কী ধরনের পরিবর্তন ও অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে?
উপাচার্য : শিক্ষা খাতে বিগত ১৬-১৭ বছরে যে ক্ষতি হয়েছে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে সময় লাগবে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের শিক্ষা খাত তথা প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনা গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব ভায়োলেন্স থেকে ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমাদের আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ শিক্ষার্থী। সেই আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের থেমে যাওয়া শিক্ষার চাকা চালু করেছি। ইতোমধ্যে ১৬টি পরীক্ষা নিতে সক্ষম হয়েছি। অনেক জায়গায় প্রিন্সিপাল পালিয়ে গেছেন। কোথাও কোথাও কাগজপত্র নেই। ফাইল নেই। সেগুলোকে সংগঠিত করে একটি স্থানে আনতে পেরেছি।
প্রবা : কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন
উপাচার্য : আমাদের ৩৩টি বিষয়ে অনার্স রয়েছে। এসবের সিলেবাস পরিবর্তনে সময় লাগবে। আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতিতে সেকেলে তা পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের সফটস্কিল এবং হার্ডস্কিলে গুরুত্ব দিচ্ছি। আইসিটি ও ইংরেজি বাধ্যতামূলক করেছি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ভালো মানের শিক্ষক নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
প্রবা : সরকার ১১টি কমিশন করলেও শিক্ষা নিয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি। এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?
উপাচার্য : শিক্ষা একটি বড় জায়গা। এখানে কমিশন করার দরকার ছিল, কিন্তু সরকার করেনি। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কমিশন করতে আন্তরিক। একটা কমিশনের চিন্তাভাবনা করছে। আগামীতে যারা দেশ পরিচালনায় আসবে তাদেরও এ বিষয়ে চিন্তা করা দরকার। এর আগেও ১৪টি শিক্ষা সংস্কার কমিশন হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। সরকারকে ইনক্লুসিভ শিক্ষা কমিশন করতে অনুরোধ জানিয়েছি। যেখানে বাংলাদেশের চাহিদার আলোকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামনে রেখে তা করতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে দেনদরবার করেছি। সেখানে সমতল, পাহাড়ি, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থায় কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে। এগুলোকে সমন্বিত শিক্ষায় আনতে হবে।
প্রবা : দেশে বর্তমানে ১১ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে
উপাচার্য : দেশে বাংলা মিডিয়াম, ইংলিশ মিডিয়াম, কওমি, জেনারেলসহ ১০-১১ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব শিক্ষাব্যবস্থাকে একত্রিত করে কীভাবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে মিল রেখে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা করা যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র এখানে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রবা : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশাল প্রতিষ্ঠান। এটিকে শুধু গাজীপুর থেকে পরিচালন ও সমন্বয় করা কতটা সম্ভব?
উপাচার্য : আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি শুধু ৮ বিভাগ নয়, বরং প্রতি ২ জেলার জন্য একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র করা হবে। দেশে ৩২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা পরিচালনাসহ সবকিছু করা হবে। ইতোমধ্যে ঝিনাইদহ, কুমিল্লা ও হবিগঞ্জসহ ৩টি আঞ্চলিক কেন্দ্র চালু করেছি। এখন ৮ বিভাগেই আঞ্চলিক কেন্দ্র চালু রয়েছে। ৩২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিকেন্দ্রীকরণ হবে। ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের যাতে গাজীপুরে আসতে না হয়, সেজন্য কেন্দ্রগুলো থেকে সার্টিফিকেট দেওয়াসহ সব কাজ করা হবে।
প্রবা : সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস তথা যতটুকু পড়ায় সে অনুযায়ী পরীক্ষা নেয়। সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস বিশাল। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত সিলেবাস প্রণয়ন প্রয়োজন কি না
উপাচার্য : ঢাবি, রাবি, চবিসহ সরকারি-বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কাঠামো আলাদা। সব সিলেবাস এক নাও হতে পারে। তবে যে সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে তার মিশন-ভিশন থাকতে হবে। আর আমাদের এমন সাবজেক্ট আনতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ মাস সময় আছে। এর মধ্যে কারিকুলামগুলোর যেসব সমস্যা আছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা রিভাইস করা, মডার্ন করার কাজ আমরা করছি।
প্রবা : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি কম, বিজ্ঞানের ল্যাব হয় না। এসব সমস্যা সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন?
উপাচার্য : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে বড় ধরনের অবদান রাখছেন। তাদের মধ্যে বিশাল একটি অংশ পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করছে। বর্তমানে তাদের ক্লাসে ফিরাতে কী কী ধরনের ইনসেটিভ দেওয়া দরকার, তা নিয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। ইতোমধ্যে আমরা গত বছরের দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০ কোটি টাকার বৃত্তি দিচ্ছি। অবহেলিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অগ্রসর করতে আলাদা প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে আরও কী কী স্ট্র্যাটেজি নেওয়া দরকার তা নিয়ে কাজ করছি। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার ক্লাব গঠন করা হচ্ছে। দেশব্যাপী একের পর এক ক্যারিয়ার শো করা হচ্ছে।
প্রবা : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান?
উপাচার্য : আমরা মনে করি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার হলে, প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার হলে, দেশের ৭০ শতাংশ শিক্ষার সংস্কার হয়ে যাবে। যেসব খাতে হাত দিয়েছি, সেখানে দেশি-বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, নামিদামি শিক্ষক, গবেষক, পণ্ডিতদের দিয়ে সংস্কার কমিটি ও ট্রাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
সরকার বাজেট দিতে দেরি করলে অন্তত নিজেদের রিসোর্স দিয়ে হলেও হাতে নেওয়া সংস্কারকাজগুলো করতে পারলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের ৩০ শতাংশ যে বেকার থাকে তা আগামী ২-৪ বছর পর থাকবে না।
লেংগুয়েজ ক্লাবের মাধ্যমে বিভাগ থেকে উপজেলা পর্যায়ে এসব ক্লাব কাজ করবে। বছরে আমাদের ১০-১১ লাখ মানুষ বিদেশে যায়, তাদের শিক্ষিত করা যাবে। আর এটি করতে পারলে রেমিট্যান্স দ্বিগুণ হয়ে ১০০ বিলিয়ন করা যাবে। এজন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং দরকার।
প্রবা : কী ধরনের বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেন?
উপাচার্য : আমাদের দেশটি সবার জন্য বাসযোগ্য হবে। প্রত্যেকেই তার যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান পাবেন। সবাই শান্তি ও সুখী জীবনযাপন করবেন- এই প্রত্যাশাই সব সময় করি।