বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২২:৪১ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকদের ‘লাঞ্ছিত’ করার ঘটনায় জড়িতদের বিচার এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’র দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (সকলপ্রকার কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ) ঘোষণা করেছেন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার্স সমিতি ও শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম পৃথক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে এ ঘোষণা দেন। এদিকে তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে রাকসু নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রম কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অফিসার্স সমিতির সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মোক্তার হোসেন বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং কর্মকর্তাদের হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের দৃশ্যমান বিচার কার্যকর করতে হবে। আমাদের ‘প্রতিষ্ঠানিক সুবিধা’র দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ থাকবে। তবে রাকসু সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমসহ চিকিৎসা, পানি, বিদ্যুৎসহ জরুরি সেবা এই কর্মসূচির আওতার বাইরে থাকবে। কিন্তু ক্লাস-পরীক্ষা এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে।
এই কর্মসূচির ফলে রাকসুর পেছানোর বিষয়ে তিনি বলেন, প্রশাসন আমাদের দাবি মেনে না নিলে তাদের ব্যর্থতায় এই কর্মসূচির কারণে রাকসু নির্বাচনে কিঞ্চিৎ ব্যাঘাত ঘটলে সেই দায় প্রশাসনের, আমদের না।’
এদিকে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম তিনটি সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সিদ্ধান্তগুলো —(১) গত শনিবার রাবি ক্যাম্পাসে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন, প্রক্টর মাহবুবুর রহমান, রাকসু নির্বাচন কমিশন এনামুল হকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার জন্য তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছে (২) শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে আগামীকাল সকাল ১১টায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুদিত হবে(৩) শিক্ষকদের যারা লাঞ্ছিত করেছে তাদের দৃষ্টান্ত শাস্তি নিশ্চিৎ না করা পর্যন্ত সকল প্রকার কার্যক্রম (ক্লাস পরীক্ষাসমূহ) অনিদিষ্ট কালের জন্য বন্ধ থাকবে।
এদিকে পোষ্য কোটা স্থগিতে উপাচার্যের নেওয়া সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। রবিবার সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া সভায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পোষ্য কোটা নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রবিবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে উপাচার্যের বাসভবনে সিন্ডিকেটের এই জরুরি সভা শুরু হয়। সভা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ সাংবাদিকদের বলেন, আজ (রবিবার) সিন্ডিকেটে মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সিন্ডিকেটের ফুল বডির উপস্থিতিতে সভা হয়েছে। শনিবার ক্যাম্পাসে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্যই আমাদের আজকের সিন্ডিকেট সভা ছিল।’ তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকাগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অথবা ছাত্রদের কোনো ধরনের একটা গোলমাল লাগিয়ে দেওয়ার একটা অপচেষ্টা সম্পর্কে তাঁরা অবগত ছিলেন। এ জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্যসহ অন্য শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। রোববার সকাল থেকে তারা এ কর্মসূচি পালন করছেন।
এর আগে গত শনিবার পোষ্য কোটাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন মাটিতে পড়ে যান। এছাড়া শিক্ষার্থীরা উপ-উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রক্টরসহ বেশকিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে রোববার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাশের আমতলায় অবস্থান নিয়ে কর্মবিরতি পালন করছেন। তবে সকালে ক্যাম্পাসে সব একাডেমিক ভবনের ফটকের তালা খুলে দেওয়া হয়। প্রশাসন ভবনও খুলেছে।
শাট ডাউন প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসার সমিতির সভাপতি মুক্তার হোসেন বলেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই কাজ থেকে বিরতি থাকবেন। ক্লাস-পরীক্ষাও বন্ধ থাকবে। তবে ক্যাম্পাসে তাঁরা দৃশ্যমান (জমায়েত) কোনো কর্মসূচি পালন করবেন না। সিন্ডিকেট সভার দিকে তাঁদেরও নজর থাকবে। এই সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে কী ফল আসে তার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
রোববার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত দেখা যায়। তবে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের তেমন আনাগোনা দেখা যায়নি। নির্বাচনের আছে মাত্র তিনদিন। শেষ মূহুর্তে এসে নির্বাচনী প্রচারণা কার্যক্রমে অনেকটাই ভাটা পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব বিল্লাহ। তিনি রবীন্দ্র ভবনের সামনে বসে আছেন বেলা সাড়ে ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত। গত বৃহস্পতিবারেও তিনি এই সময়ে ক্যাম্পাসের যেকোনো জায়গায় থাকলে প্রায় অর্ধ-শতাধিক প্রার্থীর দেখা পেতেন। তবে আজ তিনি দেখা পেয়েছেন মাত্র ২জন প্রার্থীর। তিনি বলেন, ‘আমি গত দেড় ঘন্টা এখানে বসে আছি। অন্য যেকোনো দিনে এখানে বসলে অন্তত ৫০ জন প্রার্থীর দেখা পাই। আজ পেয়েছি মাত্র দুই জনের দেখা।’
নাদিয়া হক মিথি রাকসুতে লড়ছেন ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক পদে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পরে অন্যান্য দিন তিনি লিফলেট হাতে ঘুরলেও আজ তাকে দেখা গেছে বন্ধুদের সঙ্গেআড্ডায়। তিনি জানান, ‘কর্মবিরতির জন্য ক্যাম্পাসে আজ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম। অন্যদিকে এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রচারণা করাটাও অস্বস্তিকর।’
এদিকে নির্বাচন ৩ দিন পিছিয়ে যাওয়ার একটি গুঞ্জন ক্যাম্পাস জুরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৫ তারিখেই অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
রবিবার সন্ধ্যায় রাকসু কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেললে এ কথা জানান নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা কামাল আকন্দ। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২৫ তারিখের ভোট পেছানোর কোনো ধরণের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নেয়নি। আমরা দেখবো, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে নির্বাচন ২৫ তারিখেই অনুষ্ঠিত হবে।’