হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম
দেড় শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন পাঠাগার ভবনটি আঁকড়ে রেখেছে একটি পাকুড় বৃক্ষ । প্রবা ফটো
‘ইতিহাস’ বাংলা ভাষার এই তৎসম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষার 'ইতিহ' শব্দমূল থেকে, যার অর্থ 'ঐতিহ্য'। আর ইতিহাস শব্দটির রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়: ইতহ+অস্+অ, যার অর্থ হলো- 'এমনটিই ঘটেছিল।' বর্তমানের তিলোত্তমা ঢাকা মহানগরী সাক্ষ্য দেয় আজ থেকে ঠিক ১৫৪ বছর আগে এমনই এক ঘটনার জন্ম হয়েছিল, যা এক অনন্য ইতিহাস। স্মরণ করা যাক- ঢাকার প্রথম লাইব্রেরি বা পাঠাগার রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি ভবনের কথা।
কালের সাক্ষী হয়ে এখনও টিকে আছে ভবনটি। দোতলা এই ভবনটির এখন খুবই নাজুক অবস্থা। দেয়ালগুলোর বিভিন্ন স্থানে ধরেছে ফাটল। ভেঙে পড়েছে ভবনের অধিকাংশ দরজা-জানালা, বাকিগুলোরও যায় যায় দশা। যেকোনো সময় ভবনটি ধসে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির ছাদে, চারপাশের দেয়ালে-কার্নিশে বেড়ে ওঠা নানা ধরনের গাছগাছালি। পার্শ্ববর্তী একটা ভবনে উঠে দেখা গেছে লাইব্রেরি ভবনের পুরো ছাদ ঝোপঝাড়ে ঢাকা। ভবনটিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় কী কী গাছ-ঘাস বা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদে জঙ্গলের সৃষ্টি হয়েছে; তা জানা যায়নি।
ভবনের চারপাশ ঘুরে বট-পাকুড়, ডুমুর গাছসহ বিভিন্ন ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের রমরমা অবস্থা দেখা গেছে। ভবনের সামনের একেবারে মাঝামাঝি অংশের দেয়াল ও ছাদ বেয়ে বেড়ে উঠেছে বিশালাকার একটা পাকুড়গাছ, সেই গাছের শেকড় দেয়াল বেয়ে নিচের দিকে নেমে মাটি ছুঁয়েছে! ভবনের অন্য পাশগুলোতে বেশ কিছু বট-পাকুড়ের গাছ বিস্তৃত জায়গাজুড়ে তার শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়েছে।
রামমোহন রায় লাইব্রেরি ভবনের এ অবস্থা প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ ব্রাহ্ম সমাজের সাধারণ সম্পাদক রনবীর পাল রবির সঙ্গে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বললেন, লাইব্রেরি ভবনটি সদরঘাট এলাকার এমন জায়গায় অবস্থিত। এর আশপাশে ইসলামপুর কাপড়ের মার্কেট, মিটফোর্ডের ওষুধ মার্কেট, বাদামতলীর চাল ও ফলের মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেট। যে কারণে পাটুয়াটুলী বা রামমোহন রায় লাইব্রেরি ভবন ঘেঁষা এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন প্রচুর লোক যাতায়াত করে, প্রচুর মালবোঝাই ভারী ভারী কাভার্ড ভ্যানসহ
বিভিন্ন গাড়ি চলাচল করে। এসব গাড়ির চলাচলের ঝাঁকুনিতে প্রতিনিয়তই ভবনটি ভেঙে পড়ার দিকে হেলে যাচ্ছে। ঈশ্বর না করুক; ভবনটি ভেঙে পড়লে জানমালের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু আইনি সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে এটা (লাইব্রেরি ভবনটা) নিয়ে আমরা কোনোকিছু চিন্তা-ভাবনা করতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেকোনো সময় রাস্তার ওপর ধসে পড়তে পারে- এ আশঙ্কায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল সাত দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য ও ট্রাস্টি প্রাণেশ সমাদ্দার উচ্চ আদালতে রিট করে ঐতিহ্যবাহী ভবনটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্তির আবেদন করেন। পাশাপাশি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে একই দাবি জানিয়ে আরেকটি আবেদন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০০৯ সালে এক প্রতিবেদনে বলে, পুরাকীর্তি আইনের আওতায় এ নিদর্শনটি প্রাচীন কীর্তি হিসেবে গণ্য করা যায় না। কারণ, ভবনটির স্থাপত্যশৈলীতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নেই। তা ছাড়া ভবনটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণেরও উপযোগী নয়। তবে একই বছর অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন জানায়, রাজউকের করা ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকার ৯৩টি স্থাপনার মধ্যে আছে এই পাঠাগারটিও। সে কারণে রাজউকের নগর উন্নয়ন কমিটির অনুমোদন ছাড়া তালিকাভুক্ত স্থাপনার আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ অপসারণ, পুনর্নির্মাণ ও পরিবর্ধন করা যাবে না।
ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বনামখ্যাত গবেষক হাশেম সুফি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পাঠাগারটি ঐতিহ্যবাহী, কিন্তু পাঠাগারের বিল্ডিংটি বা ভবনটি ঐতিহ্যবাহী নয়। পুরাতন হলেই যে একটা বিল্ডিং হেরিটেজ বা ঐতিহ্যের আওতায় পড়বে- বিষয়টি এমন নয়। ভবনটির গঠনশৈলী থেকে শুরু করে সবকিছুই সাধারণ। এটা ভেঙে
নতুন করে বিল্ডিং তৈরি করে বৃহৎ পরিসরে পাঠাগারটা ভালো করে চালু করা উচিত।
এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষরা বলছেন- আইনি জটিলতায় থমকে থাকা এ পাঠাগারটির মূল ভবনের সংস্কার কিংবা ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা না হলে এক সময় হয়তো মাটির সঙ্গে মিশে যাবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, কেশবচন্দ্র সেন, প্রেম ও প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ, লেখক ও গবেষক বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, নাগরিক কবি শামসুর রাহমানসহ বহু মনিষীর সস্মৃতিধন্য ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষ্যবহ ঢাকার ইতিহাসের প্রথম পাঠাগারের এই ভবনটি।
প্রসঙ্গত, পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলকে পেছনে ফেলে পাটুয়াটুলীতে প্রবেশমাত্রই রাস্তার ঠিক ডানপাশে তাকালেই নজরে পড়বে 'ব্রাহ্ম সমাজ' ভবন। ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্রাহ্ম সমাজ কর্তৃপক্ষই সে সময় ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা, ধর্মালোচনা ও সমাজ সংস্কারমূলক কাজের পাশাপাশি একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ গড়ে তোলার অন্যতম উদ্যোক্তা ও ঢাকার নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ অভয়চন্দ্র দাস। তার নেতৃত্বেই ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরের দোতলার একটি কক্ষে ১৮৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে যাত্রা শুরু করে ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলার রেনেসাঁ বা নবজাগরণের প্রধানতম পুরুষ রাজা রামমোহন রায়ের নামানুসারে নামকরণ করা 'রামমোহন রায় লাইব্রেরি'। আর ব্রাহ্ম সমাজের অন্তর্ভুক্ত আঙিনায় ১৯০৯ সালে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয় লাইব্রেরিটির নিজস্ব ভবনের এবং ১৯১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে
চালু হয় পরিত্যক্ত তকমা নিয়ে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থাকা আজকের এই ভগ্নদশাগ্রস্ত দ্বিতল এ লাইব্রেরি ভবনটি। আর, ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এ পাঠাগারের কার্যক্রম চলছে মন্দির ভবনের যে ঘরে আজ থেকে ১৫৪ বছর আগে পাঠাগারটি চালু হয়েছিল সেই ঘরে।