হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৫ ১০:৪৪ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি সাধারণত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কবলে পড়ে। তবে সম্প্রতি সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের (এটিইউএমইও) ৮৬টি পদোন্নতি নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা ব্যতিক্রম। কারণ, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ, আইন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক তাগাদা সত্ত্বেও পদোন্নতির গেজেট আটকে আছে প্রায় ১০ মাস ধরে।
সুপারিশ থেকে স্থবিরতা : ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পিএসসির চাহিদার ভিত্তিতে আইন মন্ত্রণালয় ৮৬ জন সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও ১৭ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদোন্নতিতে অনাপত্তি জানায়। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদায়ন সম্পন্ন হয়। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের এই ৮৬ জনের পদোন্নতি এখনও ঝুলে আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেগম বদরুন নাহার বলেন, তারা বারবার মাউশিকে (মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর) জ্যেষ্ঠতার তালিকা পাঠাতে বলেছেন। কিন্তু তারা এখনও পাঠায়নি। তবে পদোন্নতিতে মন্ত্রণালয়ের কোনো অনীহা নেই।
অন্যদিকে মাউশির উপপরিচালক (সাধারণ প্রশাসন) মো. শাহজাহান দাবি করেন, ‘তালিকা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। দ্রুতই পাঠানো হবে।’
দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও আপত্তি : অভিযোগ রয়েছেÑ মাউশির সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর অহিদুর রহমান এবং নোয়াখালীর সেনবাগ সরকারি কলেজের প্রধান সহকারী সৈয়দ লিয়াকত আলী নানা অজুহাতে পদোন্নতি আটকে রাখছেন। অহিদুরের সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। অথচ পদোন্নতির শর্ত হলোÑ বিএডসহ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক প্রভাব, আদালতে রিট এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করে প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করেছেন। অন্যদিকে, সৈয়দ লিয়াকত আলীর ফিডার পদের যোগ্যতাও পূর্ণ হয়নি।
পিএসসি এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখে জানিয়েছে, ‘কোনো নিয়ম লঙ্ঘিত হয়নি, অভিযোগ ভিত্তিহীন।’ আইন মন্ত্রণালয়ও স্পষ্ট মত দিয়েছে- ‘পদোন্নতিতে আইনি বাধা নেই।’
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়নি : ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভায় অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ঘোষণা করে রেজল্যুশন প্রকাশ করা হয়। এর পরেও মাউশি গেজেট প্রকাশের পথে এগোয়নি। চলতি বছরের ২৩ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রহিমা আক্তার ফের মাউশিকে জ্যেষ্ঠতার হালনাগাদ তালিকা দ্রুত পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু এখনও কোনো অগ্রগতি নেই।
দুর্নীতি ও অদৃশ্য শক্তির প্রভাব : অহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক অভিযোগ রয়েছেÑ অফিস সহকর্মীকে প্রাণনাশের হুমকি, ব্যক্তিগত কাজে সরকারি ঠিকানা ব্যবহার, এমনকি দুর্নীতির মামলাও। লিয়াকতের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তবুও তারা কীভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে এত দীর্ঘ সময় আটকে রাখতে সক্ষম, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা।
পদোন্নতির দাবিদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি না, সবুজ সংকেত থাকার পরও গেজেট হচ্ছে না কেন। দুজন কর্মচারীর কারণে ৮৬ জনের ন্যায্য অধিকার আটকে থাকবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি প্রক্রিয়া অনেক সময় ধীরগতির হলেও এখানে প্রশাসনিক জটিলতা নয়, বরং ব্যক্তি স্বার্থই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব দপ্তরের সম্মতি থাকলেও দুজন কর্মচারীর আপত্তি ও প্রভাবের কারণে পুরো প্রক্রিয়া স্থবিরÑ এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য অশনিসংকেত। শিক্ষা খাতের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মকর্তাদের ন্যায্য প্রাপ্য দীর্ঘদিন আটকে রাখা মানে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এর ফলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা বাড়বে।
এখন প্রশ্ন উঠেছেÑ অহিদুর ও লিয়াকতের এত শক্তির উৎস কোথায়? আর মাউশি কেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কার্যকর করছে না?