প্রান্ত কুমার দাশ, রাবি
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৩৫ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভবন। ছবি : সংগৃহীত
চব্বিশের জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সেই রক্তিম রাত ১৪ জুলাই। তালাবদ্ধ হলের গেইট ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা পুরুষ সহপাঠীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বদলে দিয়েছিলেন আন্দোলনের ধারা। লিখেছিলেন সাহসের এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে, সেই দৃশ্য যেন কেবল স্মৃতির পাতায়।
আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। সম্ভাব্য প্রার্থী ও প্যানেল নিয়ে চলছে নানান আলোচনা ও বিশ্লেষণ। সামাজিক মাধ্যম থেকে চায়ের আড্ডা, সবখানেই সরব পুরুষ শিক্ষার্থীরা। কিন্তু নারীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে প্রায় নেই বললেই চলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও ছাত্রীরা বলছেন, নারী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো পরিবেশ এখনও ক্যাম্পাসে তৈরি হয়নি। সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সম্মানহানির আশঙ্কা নারীদের নিরুৎসাহিত করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদিও ‘এন্টি সাইবার বুলিং সেল’ গঠনের আশ্বাস দিয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের রাকসু নির্বাচনে মোট ২৫ হাজার ১২৭ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশ নারী। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র দুইজন নারী শিক্ষার্থী ফেসবুকে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন। তারা হলেন, বাংলা বিভাগের নিশা আক্তার এবং মন্নুজান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আফরিন জাহান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫ জন সচেতন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাদের কয়েকজনের রাকসু নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ থাকলেও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইনে হয়রানির ভয়। তারা বলছেন, প্রার্থী হলে তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়াসহ এসব নোংরামির শিকার হতে হবে। ফলে মানসিক চাপ সামলে নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আমারও আছে। কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়ালেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য, এমনকি আমার ছবি এডিট করে বাজেভাবে প্রচার করার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এই মানসিক চাপ সহ্য করে নির্বাচন করাটা কঠিন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পুরুষ প্রার্থীরা রাজনৈতিক সমালোচনা করেন, কিন্তু নারী প্রার্থী হলে সেই সমালোচনা সরাসরি চরিত্র ও ব্যক্তিগত জীবনে চলে যায়। এই অসম্মানজনক পরিস্থিতি এড়াতেই অনেকে চুপ করে আছি।’
ইউনাইটেড স্টুডেন্টস ডেমোক্রেটিক ফোরামের সংগঠক (ইউএসডিএফ) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খান বলেন, ‘ক্যাম্পাসে নারী প্রার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নেই। নির্বাচনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘পরিবেশ পরিষদ’ গঠনের দাবি উঠলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। আমার ধারণা, এজন্য আমার মতো অনেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর ও সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সুষ্মিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে নারীদের চরিত্র হনন এখন নিত্যদিনের ঘটনা, যা নির্বাচনী অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তবে বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন নারী নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তাদের দাবি, প্যানেলে নারীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পদ রাখা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। ৫ আগস্টের পরে কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী ‘সাইবার বুলিং’ ও ‘বট’ সন্ত্রাসের সংস্কৃতি চালু করেছে। এতে অনেক নারী শিক্ষার্থী নির্বাচনে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন। তবে গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট নারীদের প্যানেলে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক ও রাকসুর ভিপি (সহ-সভাপতি) পদপ্রার্থী মেহেদী সজীব বলেন, ‘আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের প্যানেলে নারী বিষয়ক সম্পাদকসহ অন্য পদে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ থাকবে।’
ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাকসুতে আমাদের বোনদের সমান অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাই।’
ছাত্রদলের শাখা সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘প্রশাসন তড়িঘড়ি করে রাকসুর তফসিল ঘোষণা করেছে। শিক্ষার্থীদের রাকসু সম্পর্কে সচেতন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিতের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সাইবার বুলিং শনাক্তে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নেই। তবে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি ‘সাইবার বুলিং প্রতিরোধ সেল’ গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।