প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৯:১৬ পিএম
বেরোবি সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় গ্রেপ্তার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ড. কলিমুল্লাহসহ মামলার পাঁচ আসামিকে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত এই আদেশ দেন।
এদিন তাকে আদালতে হাজির করার পর কারাগারে আটক রাখার আবেদন করে দুদক। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তার জামিন চেয়ে শুনানি করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এবং আসামিদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন।
এর আগে গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবির) সহযোগিতায় দুদক টিম ড. কলিমুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে। পরে সাবেক এ ভিসিকে দুদকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন জানান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থাকা অবস্থায় ড. কলিমুল্লাহর বিরুদ্ধে উন্নয়ন তহবিলের অর্থ আত্মসাতসহ নানা দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ পায় দুদক। দুর্নীতির অভিযোগ আমলে নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে অনুসন্ধান করা হয়। গত ১৮ জুন ড. কলিমুল্লাহসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
দুদক জানিয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্বে ছিলেন ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। এর আগে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভিসি ছিলেন নূর-উন-নবী। সাবেক দুই ভিসিসহ বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগে ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। সেই মামলায় নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মামলায় অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভিসি কলিমুল্লাহসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। ড. কলিমুল্লাহ ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক একেএম নূর-উন-নবী, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, দুই ঠিকাদার মো. আ. সালাম বাচ্চু এবং এমএম হাবিবুর রহমান।
মামলায় বলা হয়, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন করেন এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ব্যতিরেকে ৩০ কোটিরও অধিক মূল্যের চুক্তি সম্পাদন করেন। ঠিকাদারের বিল থেকে কর্তন করা নিরাপত্তা জামানতের টাকা এফডিআর করে তা লিয়েনে রেখে ৪ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্যারান্টার করা হয়।
দুদক আরও জানায়, অগ্রিম অর্থ প্রদানের অনুমোদন না থাকলেও ঠিকাদারকে অগ্রিম বিল দেওয়া হয় এবং বিল সমন্বয়ের আগেই ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করা হয়। এছাড়া, প্রথম পরামর্শকের ডিজাইন উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে দ্বিতীয় পরামর্শক নিয়োগ এবং দরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। এই কর্মকাণ্ড দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য ছিলেন। এর বাইরেও তিনি জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়ীত্ব পালন করছেন। ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে ২০১৭ সালের পর থেকেই। ২০২১ সাল পর্যন্ত ভিসি থাকলেও তিনি ঠিকমতো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতেন না। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ১১১টি দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বৃহৎ সংগঠন অধিকার সুরক্ষা পরিষদ।
২০১৯ সালে শিক্ষকদের একাংশের সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি কমলেশ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান স্বাক্ষরিত শিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠানো উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার ৪৫টি অভিযোগ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল, ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইন্সটিটিউটসহ স্বাধীনতার স্মারক নির্মাণকাজেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের সত্যতা পায় ইউজিসির একটি তদন্ত কমিটি। একপর্যায়ে নানা সমালোচনার মধ্যে আওয়ামী লীগের সময়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।