রাবিতে শিক্ষক নিয়োগ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৫ ১৬:১০ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক নিয়োগে এক প্রার্থীর ভাইভাতে জামায়াতপন্থী সাবেক এক এমপির সুপারিশের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাবি উপ-উপাচার্যের ফেসবুক স্টোরিতে 'ভুলবশত' প্রবেশপত্র প্রকাশিত হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যেমে শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়।
ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রভাষক পদে আবেদনকারীর নাম আজমীরা আফরিন। আগামী ৪ আগস্ট তাঁর সাক্ষাৎকার। আবেদনকারীর প্রবেশপত্রে সুপারিশ করেন চাপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং রাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের জীবন সদস্য লতিফুর রহমান। তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৯১ সালে জামায়াতের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন।
দুইদিন আগে ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির আনন্দ মিছিল শেষে সমাবেশে সভাপতি সুলতান আহমদ রাহী বলেন, ‘উপাচার্য শিক্ষার্থীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানী করে নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’
শনিবার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান রাহীর ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করা সেই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘রাবির একজন সাবেক ছাত্রের কাছ থেকে এধরনের মিথ্যা ও মনগড়া মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অসম্মানজনক! বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত এই মন্তব্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া।’
এ ঘটনার পরে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপ-উপাচার্যের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টের এক স্টোরিতে চাকরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্রটি প্রকাশিত হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোস্টটি মুছে ফেলা হয় এবং এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি একটি পোস্ট লেখেন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমার ফেসবুকে হয়তো ভুলবশত একটি প্রবেশপত্র আপলোড হয়েছে। প্রতিদিনই অনেক আবেদনকারী বা তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে সিভি, প্রবেশপত্র দিয়ে যায়। রুয়ার নির্বাচনের সময় একজন আলামনাস (সাবেক এমপি) ফোন করে উনার এলাকার একজন আবেদনকারীর কথা বলেন। আমার অফিস এবং ফোনে এরকম ডজনখানেক সুপারিশ আছে। তবে এগুলো কোনোভাবেই লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব ফেলে না। আশা করি, বিষয়টি নিয়ে কেউ ভুল বুঝবেন না।’
এ দিকে স্টোরিটি শেয়ার হওয়ার পরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শুরু হয় আলোচনা সমালোচনার।
ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী মিথ্যাবাদী না মাননীয় উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব স্যার?
সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী মিশু লেখেন, ‘সুপারিশে আসা বাকি সমস্ত প্রবেশপত্র পোস্ট করার দাবি জানাচ্ছি। আমরা জানতে চাই কারা এইটারে বিশ্ববিদ্যালয় না ভাইভা দলীয় গোয়ালঘর বানাতে চায়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আরেক সমন্বয়ক সালাহউদ্দিন আম্মার লেখেন, ‘কাল রাতে আমাদের প্রো-ভিসি মহোদয়ের ছেলে ছাগলকান্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন। গেমস খেলতে গিয়ে বাবার ফোন থেকে একজন জামায়াতপন্থী সাবেক এমপির রেফারেন্সসহ প্রবেশপত্র স্টোরি দিয়ে ফেলে। স্যার ক্লারিফিকেশনে লিখলেন এমন অনেক রেফারেন্স ওনার হোয়াটসঅ্যাপ, মেইল বা সরাসরি আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- আপনাদের কাছে রেফারেন্স দেওয়ার সাহস কেনো পাবে? আপনারা কোন চেতনায় প্রশাসনে বসেছেন ভুলে গেছেন স্যার? রেফারেন্স লেটার দেওয়ার কারণে এই তিনজনকে চাকরি দিবোনা সিদ্ধান্ত এমন হওয়া উচিত ছিলো।’
প্রবেশপত্রে কোনো সুপারিশের কথা অস্বীকার করলেও মুঠোফোনে উপ-উপাচার্যকে চাকরিপ্রার্থীর বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান সুপারিশকারী জামায়াতের সাবেক এমপি মো. লতিফুর রহমান। রবিবার সকালে তিনি বলেন, ‘চাকুরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্রে সুপারিশ করা হয়েছে এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে এটা সত্য যে, ওই প্রার্থীর বিষয়ে উপ-উপাচার্যকে ফোনে সুপারিশ করা হয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, বিগত দিনে ভাইভাগুলোতে অনেক বাজে চর্চা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে আমরা এটা চাই না। আপনি এই প্রার্থীর আবেদনপত্রটা দেখবেন। আবেদনকারীর বিভাগের ফলাফল অনেক ভালো।”
তিনি আরও বলেন, ‘এর বেশি আর কিছু বলতে পারছি না। আমি অসুস্থ।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, ২৪'র গণঅভ্যুত্থানে একটা পরিবর্তন আসলেও আমাদের চিন্তাগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। সত্য কথা হচ্ছে, বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশ, তদবির এগুলো কোনো কিছুই বন্ধ হয়নি। এখনও দপ্তরগুলোতে শত শত তদবির জমা পড়ছে। এই ধরনের খারাপ প্র্যাকটিস আসলে কোনোটাই পাল্টায়নি। এগুলো মানুষ এখনও করছে যা খুবই দুঃখজনক। তবে আমরা চেষ্টা করছি, কোনো ধরনের অন্যায় আবদার, তদবির এবং আর্থিক দুর্নীতিকে কোনো প্রশ্রয় দেব না। মানুষের কাজ মানুষ করবে, আমরা আমাদের মতো করে আমাদের কাজ করার চেষ্টা করছি।