আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৫ ১০:০৬ এএম
চট্টগ্রামের বাকলিয়া আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক দুই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের জেরে করা দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে দুর্নীতির মাধ্যমে ছয় বছরে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৭২ লাখ টাকা।
উন্নয়ন, প্রকাশনা, সিসিটিভি ক্রয়সহ নানা খাতে ভাউচার দেখিয়ে এসব অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে এসবের বেশিরভাগের আবার রসিদ নেই। অনেক ক্ষেত্রে রসিদ থাকলেও তাতে নেই অর্থ কমিটির সই। কিছু ক্ষেত্রে রসিদের তারিখের সঙ্গে মিল নেই ভাউচারে দেওয়া তারিখে। এমন ১১৫টি ভাউচারের মাধ্যমে এসব টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে উঠে এসেছে নিরীক্ষায়।
প্রতিবেদন দুটির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মাঈন উদ্দিন ও সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক নাজনীন হক চৌধুরী এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে মাঈন উদ্দিন ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অন্যদিকে নাজনীন হক চৌধুরী সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে গত মার্চ পর্যন্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর মাঈন উদ্দিন এবং গত ১১ মার্চ নাজনীন হক চৌধুরী ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ’ করেন।
আগে থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের মধ্যে এই দুই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ ডিসেম্বর এক বোর্ড সভায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার নির্দেশ দেন। এদিন অভিভাবক সদস্য আশরাফুল আলমকে আহ্বায়ক করে নিরীক্ষা কমিটি করা হয়। গত মে মাসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখাও তদন্তের অনুমোদন দেয়।
অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার পাশাপাশি স্বতন্ত্র নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও আর্থিক নিরীক্ষা করানো হয়। এই নিরীক্ষার দায়িত্ব পায় শফিক বসাক অ্যান্ড কোং। দুই প্রতিবেদনেই বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাবে গরমিল পাওয়া যায়। অভ্যন্তরীণ হিসেবে প্রায় ১৬ লাখ টাকার লেনদেন গরমিল পাওয়া গেছে। আর স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী এর পরিমাণ আরও বেশি। তারা ৭২ লাখ টাকার হিসাবে গরমিল পেয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান শফিক বসাক অ্যান্ড কোং। সেখানে ৩০ জুন ২০১৯ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অন্তত ১১৫টি ভুয়া ভাউচারে ৭২ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে ভাউচারের সঙ্গে টাকার রসিদের তারিখ মিল নেই ও আর্থিক কমিটির সইয়ের তারিখও মিল নেই। মাঈন উদ্দিনের বিরুদ্ধে ভবিষ্য তহবিল থেকে নিয়ম না মেনে ঋণ নেওয়ার প্রমাণও পায় নিরীক্ষক।
এর আগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি। এতে বলা হয়, ফেব্রুয়ারি ২০২০ থেকে আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। সেখানে উন্নয়ন, সরঞ্জাম কেনা, জায়গা ভরাট, জেনারেটর বিলসহ বিভিন্ন হিসাব দেখা গেছে। এর মধ্যে অধিকাংশের ভাউচার নেই, কিছু ভুয়া আবার কিছু ভাউচারে তারিখে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মাঈন উদ্দিন ব্যক্তিগত গ্যাস বিলের জন্যও টাকা নিয়েছেন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মধুসূদন দাশ বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সিটি মেয়র। আমরা তার কাছে সব প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। জেলা প্রশাসনে অভিযোগের পর স্থানীয় সরকার শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিদ্যালয় ঘুরে গেছেন।
স্থানীয় সরকার শাখার জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার এসএমএন জামিউল হিকমা বলেন, ‘আমরা তদন্ত পর্যালোচনা করছি। দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিব।’
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে সাবেক প্রধান শিক্ষক মাঈন উদ্দিনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক নাজনীন হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাকে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। আমি হাইকোর্টে রিট করেছি। আর্থিক বিষয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষকের কোনো হাত থাকে না। এটি আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে তারা।’