ফিরে দেখা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৫ ০৯:২৬ এএম
গত বছরের ১৫ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ)। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সারা দেশে চার শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আহত হন ২৯৭ জন। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
১৫ জুলাই দুপুর ১২টার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। বেলা ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্রলীগের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। বিজয় একাত্তর হলের সামনে সংঘর্ষের সূচনা। তখন আশপাশের হল ও মধুর ক্যান্টিন থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা এসে মল চত্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। ছাত্রলীগের হামলার মুখে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। অনেকে ভিসি চত্বর এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সাত কলেজে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মহড়া দেয়। এ হামলায় অনেক নারী শিক্ষার্থীসহ প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নেন। বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হন।
ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করা হয়েছে। আহতদের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পরও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেছে। ককটেল নিক্ষেপ করেছে। পুলিশ কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। আমাদের ওপর এ হামলা পরিকল্পিত। এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
ক্যাম্পাসের সহিংসতার ঘটনায় করণীয় ঠিক করতে এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে বেঠক করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল। বৈঠক শেষে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রাধ্যক্ষরা রাতভর হলে অবস্থান করবেন।’
সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয় পুলিশ। সন্ধ্যার পরপরই ক্যাম্পাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। এদিন কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজধানীর নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া রাজধানীর বাইরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন।
এদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার’ স্লোগান দেওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জাও লাগে না।’ অপরদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা আত্মস্বীকৃত রাজাকার, গত রাতে নিজেদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। এর জবাব ছাত্রলীগই দেবে।’ সেদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা নিজেদের ‘রাজাকার’ বলে স্লোগান দিয়েছে, তাদের শেষ দেখে ছাড়বেন বলে হুমকি দেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। এই দুজনের এমন বক্তব্যের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই বেলা ৩টার দিকে দেশব্যাপী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল এবং এই আন্দোলনে দেশের সাধারণ মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।