অরণ্য ইমতিয়াজ, টাঙ্গাইল
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৫ ১৮:৩৭ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৫ ১৯:৫৪ পিএম
মহিষমারা কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজ প্রাঙ্গণে সবজি চাষ করছে। প্রবা ফটো
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়ার পর শুধু চাকরির আশায় বসে থাকেন। অথচ তাদের মাঝেই রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা, যা ব্যবহার করে তারা হতে পারেন আত্মনির্ভর ও উদ্যোক্তা। লেখাপড়ার পাশাপাশি উৎপাদনমুখী শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে পারলে শুধু ব্যক্তি নয়, দেশও পাবে উপকার।
এমন চিন্তা থেকেই টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার মহিষমারা কলেজে গড়ে তোলা হয়েছে একটি অনন্য উদ্যোগÑ উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রম। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কৃষি শিক্ষায় হাতেকলমে দক্ষ করে তুলছে, স্বাবলম্বী করছে, এমনকি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথও দেখাচ্ছে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত আদর্শ কৃষক মো. ছানোয়ার হোসেন। তার বিশ্বাস, শিক্ষার্থীদের যদি পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক কৃষি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে দেশের বিপুল পরিমাণ জমি খাদ্য উৎপাদনের আওতায় আসবে, নিশ্চিত হবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীরাও হবে স্বাবলম্বী।
২০১৯ সালে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেই শুরু হয় এই কার্যক্রম। শুরুতে কিছুটা অনাগ্রহ থাকলেও ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীরা আগ্রহী হয়ে ওঠে। কলেজের ৪০ শতাংশ জায়গায় প্লট তৈরি করে সবজি চাষ শুরু করা হয়, যাতে সহযোগিতা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
কলেজের প্রভাষক শহীদুল ইসলাম জানান, আমাদের এই কার্যক্রম দেখে অনেকেই অবাক হয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিনিধিদল এসে প্রশংসা করে গেছেন।
শিক্ষার্থীরা জানান, এই কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার পর তাদের অলস সময় কমে গেছে। এখন তারা হাতে-কলমে শিখে বাড়িতেও চাষাবাদ করছেন।
কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী রোখসানা আক্তার রুবী বলেন, কলেজ থেকে কৃষি কাজ শিখে বাড়িতে ডাটা, লাউ ও মরিচ আবাদ করে থাকি। এসব সবজি আর বাজার থেকে কিনতে হয় না। এতে বাজার খরচ কমে গেছে। শিক্ষার্থী কেয়া রেমা, রবিউল হাসান ও সবুজ রানা বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি এই কাজ আমাদের সময়কে অর্থবহ করে তুলেছে। বাড়ির সবজির চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে অর্থ উপার্জনও করতে পারছি।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. আ. রাজ্জাক জানান, প্রাথমিক ব্যয় কলেজ থেকে বহন করা হলেও প্রতিষ্ঠাতা ছানোয়ার হোসেন ব্যক্তিগতভাবেও খরচ বহন করছেন। কলেজের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী এ কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে। এই উদ্যোগ শুধু মহিষমারা কলেজেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতোমধ্যে পাশের সুনামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়েও কার্যক্রম চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মধুপুর উপজেলার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উৎপাদনমুখী শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন মনে করেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই কার্যক্রম চালু হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং বিপুলসংখ্যক যুবক-যুবতি বেকারত্ব দূর করে স্বাবলম্বী হতে পারবে। তার মতে, অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র উপায় কৃষির উন্নয়ন। এজন্য অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৪০০ নম্বরে কৃষি বিষয় চালু করে ২০০ নম্বর বাস্তবভিত্তিক ব্যবহারিক রাখতে হবে। এভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় কৃষিকে সম্মানজনক ও উৎপাদনমুখী শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই গড়ে উঠবে এক দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনমুখী প্রজন্ম।